
ভবতোষ রায় মনা ►
পেটের দায়ে মানুষ কত কিছুই না করে। কিন্তু কারো জীবিকাই যদি হয় মৃতদেহ বহন করা, তবে সেই জীবনের ওজন কেমন হয়? গাইবান্ধা শহরের উপকণ্ঠে বসবাস করা ছকু মিয়া (৫৫) ঠিক এমনই এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। গত ৩০ বছর ধরে তিনি গাইবান্ধা সদর হাসপাতাল ও বিভিন্ন দুর্ঘটনা থেকে লাশ বহনের কাজ করে চলেছেন। এলাকার মানুষ তাকে এক নামে চেনে ‘লাশ টানা ছকু’ হিসেবে।
গাইবান্ধা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে বল্লমঝাড় ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রাম। এই গ্রামের রাস্তার পাশে টিনের দোচালা ঘর ছকু মিয়ার। দেখতে বেশ উচু লম্বা। বেশ সোজা সাদা চেহারা। বাপের এক ছেলে সে। সংসারে অভাবের কারণে ছোটো বেলায় স্কুলে যেতে পারেনি। জমিতেও কাজ করতে পারে না। বয়স যখন ১৪ কি ১৫ তখন বিয়ে করেন রেখা নামের এক নারীকে। তারপর অভাব আরও জেকে বসে তার উপর। অভাবের তাড়নায় খুজতে থাকেন কাজ।
একসময় ছকু মিয়ার ছিল ছোটখাটো ব্যবসা। অভাবের তাড়নায় সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারেননি। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পরিচয় হয় থানা পুলিশের সাথে। তারপর থেকেই হাসপাতালের মর্গে লাশ বহনের কাজ বেছে নেন। শুরুতে মৃতদেহ দেখে গা শিউরে উঠলেও, এখন সেটিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
রাত-বিরাত, বৃষ্টি কিংবা ঝড়-ফোন এলেই ছকু মিয়াকে ছুটতে হয়। হাসপাতালের মর্গের হিমশীতল ঘর কিংবা মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার রক্তমাখা পথ-সবই তার কর্মক্ষেত্র। কাঁধে লাশের ওজন নিয়ে তিনি যখন হাঁটেন, তখন তার নিজের শরীরের ওজন যেন বহুগুণ বেড়ে যায়। ছকু মিয়া বলেন, "প্রথমে খুব ভয় লাগত, রাতে ঘুম হতো না। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মানুষ মারা গেলে তো আর নিজে হেঁটে যেতে পারে না, আমিই তাদের শেষ গন্তব্যে পৌঁছে দিই।"
সমাজের চোখে তার পেশাটি খুব একটা সম্মানের নয়। অনেকে তাকে দেখে নাক সিটকান, অনেকে এড়িয়ে চলেন। অথচ, আইনি জটিলতা বা জরুরি প্রয়োজনে যখন প্রশাসন বা সাধারণ মানুষ বিপদে পড়েন, তখন ছকু মিয়াই হয়ে ওঠেন ভরসার নাম। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর যে সামান্য পারিশ্রমিক পান, তা দিয়ে তিন মেয়ের পড়ালেখা আর সংসারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার নিজের কোনো স্থায়ী জমি নেই, অন্যের জায়গায় টিনের চালের ঘরেই কাটে তার বাকি সময়।
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, ছকু মিয়া মানুষটা ভালো। সে একটা কঠিন কাজ করে। কিন্তু সমাজ তাকে যেভাবে অবজ্ঞার চোখে দেখে, তা ঠিক নয়। সে তো আর অপরাধ করছে না, মানুষের সেবা করছে। ছকু মিয়ার স্ত্রী রেখা বেগম বলেন, কোথাও পঁচা লাশ পড়ে আছে-খবর পেলেই পুলিশ গিয়ে হাজির হয় ছকুর বাড়িতে। নয়তো ফোনে কথা হয় তার সাথে। তারপর ভ্যান নিয়ে ছকু মিয়া হাজির লাশের পাশে।
ছকু মিয়া বলেন, মরা মানুষের লাশের খুব গন্ধ হয়। তারপরেও বাধ্য হয়েই মরা পঁচা, গলিত, গলায় ফাঁস লাগানো, কবর থেকে গন্ধযুক্ত লাশ তোলার কাজ করতে হয়। এক সময়ে মরা, পঁচা, গলা, ঝুলন্ত মানুষের লাশ দেখে খুব ভয় হতো। কিন্তু এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, জানি না কতদিন এই ভারী লাশ কাঁধে নিয়ে চলতে পারব। সরকার যদি একটা স্থায়ী ব্যবস্থা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড দিত, তবে বাকি জীবনটা হয়তো একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।
ছকু মিয়ার গল্প কেবল একজন লাশের বাহকের গল্প নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক করুণ আখ্যান। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটি কি পারবেন একটু সম্মানের সঙ্গে বাঁচার নিশ্চয়তা পেতে? নাকি মৃত্যুর মিছিলে ছকু মিয়ার নামটাও হারিয়ে যাবে অগোচরে? গাইবান্ধার সচেতন মহলের দাবি, ছকু মিয়ার মতো যারা সমাজের এমন অপরিহার্য অথচ অবহেলিত কাজ করছেন, তাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টি দেওয়া সকলের দায়িত্ব।
এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, লাশ টানার কাজ কেউ করতে চায়না। ভয়ে মরা মানুষের থেকে দুরে দাড়িয়ে দেখতে থাকে মানুষ। আমি মনে করি উনি একটি মহৎ কাজের সাথে জড়িত। ফাঁসির বিভৎস লাশ থেকে শুরু করে, পড়ে থাকা পঁচা গলা একটি মরদেহ তিনি হাতে নিয়ে বহন করেন। এমন সাহস কার আছে? আর এ কাজও কেউ করতে চায়না। সে কারনে ছকু মিয়ার পাওনা আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত।