Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৩ ঘন্টা আগে
  • ১৩ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

রং ও মাটির বাঁধনে: সান্তনাদের শিল্পকে বাঁচানোর লড়াই

রং ও মাটির বাঁধনে: সান্তনাদের শিল্পকে বাঁচানোর লড়াই

সুন্দরগঞ্জ প্রতিনিধি ►    

সান্তনা রানীর বাবাসহ পরিবরের অন্যরা ছিলেন ভিন্ন পেশার মানুষ। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে, শুরু হয় নতুন আরেক জীবনের অধ্যায়। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডিপুর ইউনিয়নের কুমার পাড়া গ্রামের স্বামী মিন্টু সরকারের পরিবারের সদস্য ছিলেন মৃৎ শিল্প বা কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ। স্বামী, শাশ^ড়ী, ননদ, জ্যাসহ প্রতিবেশি সকলে মৃৎ শিল্পের কাজ করেন। সেই সুবাধে তাকেও শুরু করতে হয় মাটি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন উপকরণ বানানোর কাজ। 

বিয়ের মাত্র সাতদিন পর থেকে স্বামীসহ পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় শুরু করেন মৃৎ শিল্পের কাজ। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে সান্তনা রাণী হয়ে উঠেন একজন দক্ষ মৃৎ শিল্পী। মাটির তৈরি উপকরণ বিক্রি করে চলছে তার সংসার। তিনি এই শিল্পকে বেঁচে রাখতে চান। সান্তনা রাণী বলেন, মাটির তৈরি উপকরণে নকশা করতে মেশিন লাগে না। হাত দিয়ে তারা নকশা তৈরি করে থাকেন। 

মানব সভ্যতার প্রাচীনতম ঐতিহ্যের অন্যতম এই মৃৎ শিল্প। কালের বিবর্তনে এবং প্লাষ্টিক শিল্পের কাছে হারিয়ে যেতে বসেছে মৃৎ শিল্প। কিন্তু এখনো মাটির তৈরি অনেক উপকরনের বেশ কদর রয়েছে। বিশেষ করে বাটনা, পালিত, পাট, গাছের টপ, সরা, হাড়িসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের পুজার কিছু সামগ্রী এখনো মাটি তৈরি উপকরণ ছাড়া হয় না। দিন দিন এর ব্যবহার কমতে শুরু করলে আজও বিলুপ্ত হয়নি। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে খোঁজ নিয়ে একটি পরিসংখানে জানা গেছে, কমপক্ষে পাঁচশত পরিবার রয়েছে কুমার সম্প্রদায়ের। তারা এখনো পেশা পরিবর্তন করতে পারে নাই। অনেকে পেশা পরিবর্তন করে ভিন্ন পেশায় জরিয়ে গেছে।

মৃৎ শিল্পী মিন্টু সরকার বলেন, আগে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে মাটির তৈরি উপকরণ বিক্রি করা হত। কিন্তু এখন তা করতে হচ্ছে না। বিভিন্ন হাট-বাজার কারুপর্ণ্যের দোকানে বিক্রি হচ্ছে মাটির তৈরির বাটনা, সরা, গাছের টপ, হাড়ি, ব্যাংক, খেলনা, কলসসহ বিভিন্ন উপকরণ। তিনি আরও বলেন, এঁটেল মাটি, পরিবহন খরচ, কাঁঠ কয়লা, রংসহ বিভিন্ন উপকরণের দামে বেড়ে যাওয়ায় এখন লাভ কমে গেছে। একটি সরা তৈরি করতে খরচ হয় ২ টাকা। সেটি পাইকারি বিক্রি হয় ৫-৬ টাকা এবং খুচরা বিক্রি হয় ১৫-২০ টাকা।

সুন্দরগঞ্জ বাজারের কারুপর্ণ্য ব্যবসায়ী রনজিৎ চন্দ্র বর্মন বলেন, মাটির তৈরি কিছু পর্ণ্যের কদর এখনো রয়েছে। তবে খুব বেশি বিক্রি হয় না। তবে গাছের টপ ও বাটনা বেশি বিক্রি হয়। তিনি বলেন, মাটির তৈরি উপকরণে খাদ্য সামগ্রী বা অন্য কিছু রাখলে সেটি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। দই রাখার সড়া, দানাগুড় রাখার কলসের চাহিদা বেশ। মাটির তৈরি কলসে পানি রাখলে সবসময় ঠান্ডা থাকে। 

ধুবনী কঞ্চিবাড়ি কুমার পাড়া গ্রামের সাধন চন্দ্র বলেন, তিনি ৫০ বছর ধরে এই পেশার সাথে রয়েছেন। এটি তার বাপ-দাদার পেশা। সেই কারনে এটি ছাড়তে পারেন নাই। তবে তার সন্তনরা ভিন্ন পেশে বেঁচে নিয়েছেন। তিনি বলেন, এই পেশায় এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। আগে মাটি কেনা লাগতো না, গাছের পাতা বা বাঁশের পাতা  নিয়ে এসে মাটির তৈরি উপকরণ পোঁড়া হত। এখন মাটি এবং কােঁঠর গুড়া কিনে এনে পুড়তে হয়। তিনি বলেন, তহবিল না থাকায় এই পেশা ধরে রাখা যাচ্ছে না। সরকার সহজ শর্তে লোন দিলে এই শিল্পকে বাঁচানো যাবে।

শান্তিরাম গ্রামের ৮০ উর্দ্ধ মো. মোজাহার আলী বলেন, মাটির তৈরি প্লেট, গ্লাস, কলস, হাড়ি, পাতিল, বাটনা, সরা, চারা, বাটির কদর ছিল। এখন তো সব প্লাষ্টিক হয়ে গেছে। মাটির তৈরি জিনিস ব্যবহারের মজাই আলাদা। এখনো মেয়ে বাটনার মধ্যে মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটেন। এর স্বাদ আলাদা। 

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আগে নদীর ঘাট থেকে এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে কুমাররা মাটির উপকরণ তৈরি করত। এখন আর সেটা হচ্ছে না। তাদেরকে মাটি কিনে কাজ করতে হচ্ছে। সরকার চাইলে সুদমুক্ত লোন দিয়ে এই শিল্পকে বেঁচে রাখতে পারবেন। এই প্রাচীনতম সংস্কৃতি। 

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad