Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৫৭ মিনিট আগে
  • ১০ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

বাংলাদেশে পেপ্যাল: বহুল প্রতীক্ষিত বাজার প্রবেশ কতোটা কাছাকাছি?

বাংলাদেশে পেপ্যাল: বহুল প্রতীক্ষিত বাজার প্রবেশ কতোটা কাছাকাছি?

অনলাইন ডেস্ক ►
ফ্রিল্যান্সার, ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের বৈধ উপায়ে আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রায় আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের সুযোগ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোকে আকর্ষণের উদ্যোগ জোরদার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৫ দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিনটি সার্কুলার জারি করে বহির্মুখী বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নীতিমালায় বেশ কিছু শিথিলতা এনেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো ২৯ জুলাই প্রবর্তিত একটি নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো, যার অধীনে দেশীয় ব্যাংকগুলো বৈশ্বিক ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (ডিপিএসপি) সাথে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (ডিভিএ) নামে বৈদেশিক মুদ্রার অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পাবে।

এই ডিভিএ কাঠামোর আওতায় গ্রাহকরা স্থানীয় ব্যাংকের সাথে সরাসরি যুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে অর্থ ধারণ ও নিষ্পত্তি করতে পারবেন। এতে ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক আয় আনা যেমন সহজ হবে, তেমনি বাৎসরিক ১২,০০০ ডলারের সাধারণ ভ্রমণ কোটার বাইরেও বৈশ্বিক লেনদেনের সুযোগ প্রসারিত হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দেশের বাজারে কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যালের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জবাবে পেপ্যাল জানিয়েছে তারা বর্তমানে তাদের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখছে। পাশাপাশি কয়েকটি দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক পেপ্যাল, গুগল ওয়ালেট, ওয়াইজ ও পেওনিয়ারের মতো বৈশ্বিক পেমেন্ট সেবাদাতাদের সাথে— ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

ডলার ওয়ালেটে সুবিধা পাবেন ফ্রিল্যান্সার ও সেবাদাতা উভয়ই

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএস-কে জানান, নতুন এই নীতিমালার লক্ষ্য একটি বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। আন্তর্জাতিক সেবার জন্য বর্তমানে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বার্ষিক ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হলেও—ইনফরমাল ফ্রিল্যান্সিং আয় ও বৈদেশিক ভ্রমণসহ সম্ভাব্য বাজারের আকার—৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত ভ্রমণে বার্ষিক খরচের পরিমাণ ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে, উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন যে, নীতিমালার আওতায় আনা-নেওয়া (ইনওয়ার্ড ও আউটওয়ার্ড) উভয় ধরনের লেনদেন অন্তর্ভুক্ত করায় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট জায়ান্টদের কাছে বাংলাদেশের বাজার অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এই নীতিগত পরিবর্তন সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। সম্প্রতি সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসার ও বড় আকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পেপ্যালের মতো অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করতে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসা ও বিদেশ ভ্রমণের খরচে স্বস্তি

শিথিল করা নিয়মগুলো কেবল ফ্রিল্যান্সিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট খরচের ক্ষেত্রকেও প্রসারিত করেছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম, শিক্ষাসংক্রান্ত ফি, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবা ও চিকিৎসার খরচ এখন প্রথাগত কার্ড লিমিট অতিক্রম না করেই ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে।

উদাহরণস্বরূপ, ব্যক্তিগত ভ্রমণে বার্ষিক কোটা ১২,০০০ ডলারে সীমাবদ্ধ থাকলেও—চিকিৎসার জন্য প্রতিবার সর্বোচ্চ ১৫,০০০ ডলার পর্যন্ত খরচ পেপ্যাল বা পেওনিয়ারের মতো ডলার ওয়ালেটের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। এর ফলে নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বা প্রথাগত ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরতা কমবে। পৃথক আরেকটি সার্কুলারে স্থানীয় ট্যুর অপারেটরদের প্রতি গ্রাহকের জন্য বার্ষিক প্রায় ৩,০০০ ডলার মূল্যের বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজ বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা নেপাল বা ভুটান ভ্রমণের মতো অনানুষ্ঠানিক লেনদেনকে ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরিয়ে আনবে।

পেপ্যাল সংকট: অভ্যন্তরীণ কৌশল নাকি আইনি বাধা?

সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে পেপ্যালের প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা নীতিগত নয়, বরং কৌশলগত। বিডিজবস ডটকমের সিইও এবং বেসিসের সাবেক সভাপতি এ কে এম ফাহিম মাশরুর স্মরণ করে বলেন, ২০১৩ সালে পেপ্যালের প্রতিনিধিরা প্রথম বাংলাদেশ সফর করেন এবং তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

প্রাথমিক আলোচনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু আইনি জটিলতার সমাধান করলেও— ২০১৪ সালে নিজস্ব কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে উদীয়মান বাজারগুলোতে ব্যবসা সম্প্রসারণ সাময়িকভাবে স্থগিত করে পেপ্যাল। ২০২৪ সালের পর পুনরায় এই আলোচনা বেগবান হয় এবং ২০২৫ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে পেপ্যালের একটি প্রতিনিধি দল আবারও ঢাকা সফর করে। তবে জাতীয় নির্বাচনের ভোটকে সামনে রেখে অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ে।

আইনি বা নীতিগত ঘাটতির কারণে পেপ্যাল বাংলাদেশে আসছে না—এমন নয়, ব্যাখ্যা করে মাশরুর উল্লেখ করেন, স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সাথে পেপ্যাল ইতোমধ্যে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করেছে। "আমাদের দিক থেকে বড় কোনো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নেই। এটি মূলত পেপ্যালের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়।

মাশরুর আরও জানান, পেওনিয়ারের মতো বিকল্প প্ল্যাটফর্মগুলো ইতোমধ্যে কার্যকরভাবে কাজ করলেও— ফি কিছুটা বেশি (প্রায় ৪%) হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও বায়ার প্রটেকশন ফিচারের কারণে ফ্রিল্যান্সারদের কাছে পেপ্যালের চাহিদা এখনও শীর্ষে।

অংশীদারত্বের সুযোগ খুঁজছে ব্যাংকগুলো

নতুন এই নীতিগত কাঠামোর সম্ভাবনাগুলো উন্মোচনে কাজ শুরু করেছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও। শীর্ষস্থানীয় একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা টিবিএস-কে জানান, নতুন সার্কুলারের অধীনে কী ধরনের পণ্য ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলা যায়, তা তারা মূল্যায়ন করছেন।

এই পর্যায়ে আমরা কেবল সুযোগগুলো খতিয়ে দেখছি। নতুন সার্কুলারের অধীনে কীভাবে আলোচনা শুরু করা যায়, কী ধরণের প্রডাক্ট আনা সম্ভব এবং কেমন চুক্তি করা যায় তা আমরা বোঝার চেষ্টা করছি, বলেন তিনি এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকরের জন্য ব্যাংকগুলোকে পেপ্যাল, গুগল ওয়ালেট বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ওয়ালেট প্রোভাইডারদের সাথে চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক ওয়ালেট প্রোভাইডাররা আমাদের সাথে কী ধরণের কাঠামোতে কাজ করতে চায়, কারণ এসব কোম্পানির অনেকেই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করেনি, বলেন ওই কর্মকর্তা।

অংশীদার যে কেবল পেপ্যালই হতে হবে তেমন নয়; এটি গুগল পে, গুগল ওয়ালেট, পেওনিয়ার বা ওয়াইজের মতো অন্য যেকোনো ফিনটেক প্ল্যাটফর্মও হতে পারে। তবে প্ল্যাটফর্মগুলোর ঝুঁকির মাত্রাও মূল্যায়ন করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। সব প্ল্যাটফর্মের ঝুঁকি এক নয়। ব্যাংকগুলো তাদের সবগুলোকে গ্রহণ করবে কি না— সেটিও একটি বিষয়। নির্দিষ্ট একটি প্ল্যাটফর্মের সাথে কাজ করা কতটা নিরাপদ, তাও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে, বলেন তিনি। ভবিষ্যতে পেপ্যাল বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমের সাথে ডলার ওয়ালেট সুবিধা পুরোপুরি চালু হলে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা বৈদেশিক আয় সহজেই বৈধ ও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে নিয়ে আসতে পারবেন।

আন্তর্জাতিক এসব সেবাদাতাদের সাথে লেনদেন নিষ্পত্তির (সেটেলমেন্ট) একাধিক রূপরেখা বা কাঠামোগত বিকল্প থাকতে পারে, যা নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার পেওনিয়ার, পেপ্যাল কিংবা ওয়াইজ-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের বৈদেশিক আয় জমা রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ডলার ওয়ালেট কাঠামোটি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে—ফ্রিল্যান্সাররা তাদের উপার্জিত অর্থ বৈধ ও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আনতে পারবেন। 

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad