Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ১ ঘন্টা আগে
  • ১২ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

দর্শকশূন্য সিনেমা হল, টিকে থাকার লড়াইয়ে গাইবান্ধার তাজ সিনেমা হল

দর্শকশূন্য সিনেমা হল, টিকে থাকার লড়াইয়ে গাইবান্ধার তাজ সিনেমা হল

মোস্তাফিজুর রহমান,
একসময় নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। নব্বইয়ের দশকে দেশের সিনেমা হলগুলো দর্শকের ভিড়ে মুখর থাকত। টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন, হাউজফুল শো আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র এখন প্রায় অতীত। প্রযুক্তির বিকাশ, অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা এবং সিনেমা হলে দর্শক কমে যাওয়ার কারণে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোও লড়ছে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে।

গাইবান্ধা শহরে একসময় তিনটি সিনেমা হল থাকলেও বর্তমানে সার্কুলার রোডের তাজ সিনেমা হল কোনোমতে টিকে আছে। ঈদ বা বিশেষ উৎসবকে কেন্দ্র করে কিছু দর্শক সমাগম হলেও বছরের অধিকাংশ সময় হলটি প্রায় দর্শকশূন্য থাকে। অনেক দিন দুটি শো চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

হলের গেটম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, সিনেমাই চলে না, মালিক বেতন দেবেন কীভাবে? এখন শেষ বয়সে এসে রিকশাও চালাতে পারব না, অন্য কাজও করতে পারব না। আমরা এখন কোথায় যাব? আগের মতো টিকিট বিক্রি হয় না। তিন-চারটি টিকিট বিক্রি করেই শো চালাতে হয়। কোনো দিন ৫০-১০০ টাকা পাই, আবার কোনো দিন তাও পাই না। নব্বইয়ের দশকের সিনেমাগুলোর গল্প ও মান অনেক ভালো ছিল। এখন যেগুলো হচ্ছে, সেগুলো ঠিক সিনেমাও নয়, নাটকও নয়। মানুষ তো বিনোদনের জন্য আসে। ভালো বিনোদন না থাকলে দর্শক আসবে কেন?

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একসময় দর্শকের ভিড়ে বসার জায়গা পাওয়া যেত না। এখন হল ফাঁকা পড়ে থাকে। আগে পুরোনো আসনের ছাড়পোকার উপদ্রব নিয়ে অভিযোগ ছিল, এখন দর্শক না থাকায় সেগুলোও যেন হারিয়ে গেছে।

আরেক গেটম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমরা এখন বেকার হওয়ার মতো অবস্থায় আছি। কোথায় গিয়ে কী কাজ করব, কে কাজ দেবে? মালিক যা দেন, তাই দিয়ে কোনোমতে চলছি। খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে।

টিকিট কাউন্টারের কর্মী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, এই সিনেমা হলে কাজ করে আমি তিন সন্তানকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়িয়েছি। অথচ এখন নিজের চলাই কঠিন হয়ে গেছে। ৩৬ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। এখন এই বয়সে পেশাও বদলাতে পারছি না। কখনো ভাবিনি চলচ্চিত্র শিল্পের এমন বেহাল অবস্থা হবে। আগে এই চারটি কাউন্টারে তিন-চারজন মিলে টিকিট বিক্রি করেও সামাল দিতে পারতাম না। এখন আমি একাই বসে থাকি, দিনে চার-পাঁচটি টিকিট বিক্রি হয়। এতে তো সিনেমা হল চলতে পারে না।

আরেক টিকিট বিক্রেতা সুমন মিয়া বলেন, এখনকার সিনেমায় গল্পের অভাব। কোথা থেকে নায়ক নায়িকা বড় হলো দাদা দাদি পরিবার নেই প্রেম হলো ছবি শেষ হলো। গল্প না থাকায় দর্শকও আগ্রহ হারাচ্ছে। নতুন সিনেমা আনলেও লোকসান গুনতে হয়। বাধ্য হয়ে পুরোনো সিনেমা চালাতে হচ্ছে। গত ঈদে ছাপানো অনেক টিকিটই বিক্রি হয়নি।

হলের পাশের চা দোকানি পান্ন মিয়া জানান, একসময় সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের কারণে তার দোকানে ভালো বিক্রি হতো। এখন দর্শক কমে যাওয়ায় ব্যবসাও আগের তুলনায় অনেক মন্দা।

তাজ সিনেমা হলের পরিচালনাকারী সৈয়দ মোহাম্মদ ইদ্রীস বলেন, সিনেমা হল পরিচালনা করা এখন খুবই কঠিন। দর্শক কমে যাওয়ায় আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। তারপরও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং হলটি চালু রাখতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং দর্শকদের হলে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

একসময় গাইবান্ধা জেলা শহরের মানুষের অন্যতম বিনোদনের কেন্দ্র ছিল মায়া সিনেমা হল, চৌধুরী সিনেমা হল ও তাজ সিনেমা হল। কিন্তু দর্শক সংকট, লোকসান, ডিজিটাল বিনোদনমাধ্যমের বিস্তার এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ, আধুনিক প্রদর্শনব্যবস্থা, দর্শকবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর সরকারি উদ্যোগ ছাড়া জেলা শহরের সিনেমা হলগুলোকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যথায় একসময় মানুষের বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সিনেমা হলগুলো কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।
 

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad