
অনলাইন ডেস্ক ►
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্ট, দুধ ও সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর এবার চিনিতেও মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এসব কণা মানবদেহে প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত এ গবেষণা পরিচালনা করেছেন গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান। ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির নমুনা বিশ্লেষণ করে এ ফল পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। পরিসংখ্যানগতভাবে এ পার্থক্য খুব বেশি না হলেও খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার আকার ছিল প্রায় ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ ছিল আঁশজাতীয়, ২১ শতাংশ খণ্ডাকৃতির, ১১ শতাংশ পাতলা স্তর এবং ৫ শতাংশ গোলাকার কণা।
গবেষকদের মতে, এসব কণা মূলত প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে খাদ্যে মিশতে পারে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে অ্যাক্রাইলোনাইট্রাইল বিউটাডিয়েন স্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট, পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন, উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন এবং নাইলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে এসব উপাদান চিনিতে মিশে যেতে পারে।
গবেষণায় সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধু চিনি থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন শরীরের প্রতি কেজি ওজনের বিপরীতে গড়ে ০.২১৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। নিয়মিত এভাবে প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, দেশে চিনি উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাইপ, ফিল্টার, বস্তা, কনভেয়ার বেল্ট এবং প্যাকেজিং উপকরণ থেকে এ দূষণ ঘটতে পারে। খোলা অবস্থায় বিক্রির সময় বাতাসের মাধ্যমে প্লাস্টিক কণাও চিনিতে মিশে যেতে পারে।
তাদের মতে, খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, উন্নত পরিশোধন ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টুথপেস্ট, দুধ, সয়াবিন তেল এবং এখন চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার ঘটনা দেশে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে প্লাস্টিক দূষণের বিস্তৃতি স্পষ্ট করছে। তাই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত নজরদারি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আরও বিস্তৃত গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।