Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৩ ঘন্টা আগে
  • ২৬ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের চিন্তা

জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের চিন্তা

অনলাইন ডেস্ক ►
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামোর  সুপারিশ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর (জুলাই-জুন) থেকে ধাপে ধাপে বস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নতুন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে বরাদ্দ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে। বাড়তি অর্থ দিয়ে শুধু নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের অর্ধেক বাস্তবায়ন করা হতে পারে।

সূত্র জানায়, পরের দুই অর্থবছরে বাকি অর্ধেক মূল বেতন এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, পুরো বেতন কাঠামো দুই বছরে বাস্তবায়নের একটি বিকল্প চিন্তাভাবনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আহমেদ তিতুমীরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এমন পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সংকেত পাওয়া গেলে আগামী অর্থবছর থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার গত ২১ এপ্রিল জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশ প্রণয়নে গঠিত আগের কমিটিকে পুনর্গঠন করে। সম্প্রতি ওই কমিটি তাদের মতামত জমা দিয়েছে। কমিটি আর্থিক চাপ বিবেচনায় রেখে নবম পে স্কেল একাধিক ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। বেতন কমিশনও একাধিক ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল। এসব সুপারিশের ভিত্তিতে এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে অর্থ বিভাগ।

গত অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করে। গত ২২ জানুয়ারি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন ধাপে বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। পুরো সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বছরে  মোট ব্যয় প্রায় এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ড. এ কে এনামুল হক সমকালকে বলেন, নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর করলে মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। এ কারণে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই অধিক যুক্তিযুক্ত। তিনি জানান, বাজারে মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে কমিশনও তিন বছরে ধাপে ধাপে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল।

সরকারের এই মুহূর্তে বেতন-ভাতা বাবদ বাড়তি ব্যয়ের আর্থিক সক্ষমতা আছে কিনা, এ বিষয়ে মতামত চাইলে  তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে কর আদায়ের দক্ষতা বাড়িয়ে সরকারের আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে আয় বাড়ানো সম্ভব। তিনি মনে করেন, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশের ঘরে থাকলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

ড. এনামুল হক আরও বলেন, নতুন পে স্কেলের লক্ষ্য কেবল বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং সরকারি সেবার মান উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা। একজন কর্মচারী যদি ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে তার কাছ থেকে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আশা করা কঠিন। দারিদ্র্যজনিত চাপ থেকে কর্মচারীদের দূরে রাখতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সরকারি চাকরিতে ধরে রাখতে উচ্চ পদগুলোর বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। পাশাপাশি অনেক শিক্ষক জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হন, যা তাদের পেশাদারিত্বে প্রভাব ফেলে। নতুন বেতন কাঠামো এ সমস্যাও কমাতে সহায়ক হবে ।

কমিশনের প্রতিবেদনে কী আছে

কমিশনের প্রতিবেদনে বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা প্রবর্তন ও  পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার। এ ছাড়া রয়েছে সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরে ভাতা পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন। কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, তাকে মাসিক দুই হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে।

কমিশন ভাতার হার বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকার স্থলে এক হাজার টাকা করা যেতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে কমিশন।

পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান এমন পেনশনভোগীদের পেনশন ১০০ শতাংশের মতো বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন পান, তাদের  ৭৫ শতাংশ এবং মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনধারীদের ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

সরকারের পরিচালন ব্যয় কেমন বাড়ছে

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট মিলিয়ে মোট ব্যয় হয়েছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এটি মোট ব্যয়ের ৮৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পরিচালন ব্যয়ের বড় খাত– কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন, বিভিন্ন ভর্তুকি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৫৮ শতাংশের কিছু বেশি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ছয় লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ছিল চার লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, অথচ অনুদানসহ মোট রাজস্ব আদায় হয় চার লাখ ৪৩ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল। অর্থাৎ, পরিচালন ব্যয় মেটাতেও সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অর্থনীতিবিদ ড. এ কে এনামুল হক বলেন, গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশে নেমে আসায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রবৃদ্ধি যদি ৫ শতাংশও হয়, তাহলে রাজস্ব দিয়ে পরিচালন ব্যয়ে মিটিয়েও কিছু উদ্বৃত্ত থাকে।

তিনি আরও বলেন, ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর প্রায় সবাই  করের বাইরে রয়েছেন। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে তারা আয়করের আওতায় চলে আসবেন, যা রাজস্ব বাড়াতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে ইতোমধ্যে পাওয়া বিশেষ ইনক্রিমেন্টগুলো সমন্বয় করা হবে।

বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা পরে স্থগিত করা হয়। তবে গত জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad