Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৫২ মিনিট আগে
  • ১৩ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

এলপিজিতে বাড়তি কমিশন দাবি, মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কায় ভোক্তা

এলপিজিতে বাড়তি কমিশন দাবি, মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কায় ভোক্তা

অনলাইন ডেস্ক ►
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কমিশন ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপের চার্জ বাড়াতে একযোগে দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে ব্যবসায়ীদের দাবির তুলনায় কম হারে কমিশন ও চার্জ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি। সুপারিশ কার্যকর হলে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বর্তমান ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা হতে পারে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, সরবরাহসংকট ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশনে এলপিজির মূল্য পুনর্নির্ধারণবিষয়ক গণশুনানিতে এসব প্রস্তাব ও আপত্তি উঠে আসে। শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর লিখিত মতামত জমা দেওয়ার জন্য ১ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে কমিশন। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আগামী সপ্তাহে নতুন দাম ঘোষণা করা হতে পারে। এদিকে নভেম্বর মাসে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

কমিশন বাড়ানোর দাবি ব্যবসায়ীদের: বর্তমানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে আমদানিকারকদের কমিশন ২০০ টাকা। এটি বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি কমিশন ২৮০ টাকা করার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ, সিলিন্ডারপ্রতি আমদানিকারকদের কমিশন ৮০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি।

অন্যদিকে পরিবেশকেরা কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। কারিগরি কমিটি খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৭০ টাকা করার সুপারিশ করলেও পরিবেশকদের দাবির বিষয়ে একই ধরনের সুপারিশ করেনি। অটোগ্যাস স্টেশন মালিকেরাও প্রতি লিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

এলপিজি মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর দাবিও এসেছে। বর্তমানে অপারেটরের প্ল্যান্ট থেকে পরিবেশক পর্যন্ত পরিবহনসহ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা। ব্যবসায়ীরা তা ২৭ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ৩৬ টাকা ৯২ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কারিগরি কমিটি এই চার্জ ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা করার সুপারিশ করেছে।

পরিবেশক পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতার আঙিনা পর্যন্ত পরিবহনসহ চার্জ প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৬৭ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব ছিল ৮ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতার চার্জ প্রতি কেজিতে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা করার সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি।

সব খরচ বিবেচনায় কারিগরি কমিটির হিসাবে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৩ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বেড়ে ১৬৪ টাকা ৬৮ পয়সা হতে পারে। এ হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়াবে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা। অর্থাৎ, সিলিন্ডারপ্রতি দাম বাড়তে পারে ১৩৯ টাকা।

ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি ব্যবসায়ীদের: কমিশন ও চার্জ বাড়ানোর পক্ষে যুদ্ধের প্রভাব, জাহাজভাড়া, পরিবহন এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ীরা।

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার থাকলেও এখন তা বেড়ে ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। সব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কেউ গ্যাস বিক্রি না করেন।

নির্ধারিত দামে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ: ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবির বিপরীতে ভোক্তা প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, গ্রাহকেরা কেন বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছেন না। অক্টোবরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপরও অনেক গ্রাহককে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করা বিইআরসির দায়িত্ব। তা না হলে গণশুনানির উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। তিনি দাম না বাড়ানোর পাশাপাশি কমিশন নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সিনিয়র সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে বারবার দাম বাড়ানো হলে বিইআরসির ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমতে পারে। নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা এবং বেশি দামে বিক্রি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমানও মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে কয়েকটি কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সেসব অভিযোগের নিষ্পত্তির আগেই কমিশন বৃদ্ধির শুনানি হচ্ছে। তার দাবি, বাড়তি দামে বিক্রির মাধ্যমে এক মাসে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ১১ লাখ টাকা জরিমানার প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, এই জরিমানার মাধ্যমে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে কি না। শুনানিতে এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে শুনানি বর্জনের ঘোষণা দেন।

সরবরাহসংকট নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ: শুনানিতে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা আমদানিকারক ও অপারেটরদের বিরুদ্ধে সরবরাহ বন্ধ রাখার অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, সংকট দেখা দিলে কোম্পানিগুলো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হওয়ায় বিইআরসি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, আমদানি করতে না পারা কয়েকটি কোম্পানির পক্ষ থেকে বাজারে পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।

জবাবে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার তদারকি জোরদার করা হচ্ছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজও চলছে।

গণশুনানি শেষে কমিশন জানিয়েছে, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব, কারিগরি কমিটির সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নভেম্বরেও অপরিবর্তিত জ্বালানি তেলের দাম: এদিকে নভেম্বর মাসে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।

বর্তমান নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হবে। গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে এসব দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল।

জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ কার্যকর হলে রান্নার গ্যাসের জন্য পরিবারগুলোর ব্যয় বাড়বে। বিশেষ করে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে নতুন দাম কার্যকর হলে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পায়, এখন সেদিকেই নজর গ্রাহকদের।

সুত্র- দৈনিক বাংলা

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad