
অনলাইন ডেস্ক ►
রংপুরের সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের ৪ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণ ছিল না; বরং ছাদে মাদক সেবনে বাধা এবং চাঁদা না দেওয়াই ছিল এ ঘটনার মূল অনুঘটক। সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয়দের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, পুলিশের অনড় অবস্থান এবং আদালতে গ্রেপ্তার দুই আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে এটা অনেকটাই পরিষ্কার যে, স্থানীয় বখাটে মাদকসেবীদের বেপরোয়া আচরণের বলি হতে হয়েছে নিরপরাধ এই পরিবারটিকে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রশাসনিক
নজরদারির অভাব ও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির সুযোগ নিয়ে ওই এলাকার বখাটে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে গণপতি চক্রবর্তীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। রংপুর নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে অন্যতম হলো মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া ও দাসপাড়া। এখানকার ৯৫ শতাংশ অধিবাসীই সনাতন ধর্মাবলম্বীর। এ এলাকায় শ্রীশ্রীপ্রভু জগদ্বন্ধু সেবাশ্রম নামে একটি মঠসহ মাসুয়াপাড়া কালীমন্দির, বৈরাগীপাড়া কালীমন্দিরসহ ছোট-বড় কয়েকটি মন্দির রয়েছে। তাদের নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনো ভেদাভেদ নেই। তাই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক কোনো অজুহাতের বিষয় পরিলক্ষিত হয়নি।
স্থানীয় অধিবাসী, নিহতদের স্বজন এবং পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে যে, চাঁদা না দেওয়া এবং মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের যেসব বাড়িতে সিসিক্যামেরা রয়েছে, পুলিশ সেগুলোর ফুটেজ নিয়ে গেছে।এ বিষয়ে নিহত গণপতি মাস্টারের প্রতিবেশী ব্যাংকার বিপ্লব কুমার ও রামনাথ দাসের বাসায় গেলে তারা সিসি ফুটেজের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। বিপ্লব কুমারের মা দিপালী দাস বলেন, পুলিশ আমাদের বাসার সিসি ফুটেজ নিয়ে গেছে।
স্থানীয়দের বক্তব্যেও মাদক কানেকশন
মাছুয়াপাড়ার শ্রীমতি জবা রানী ও পল্লবী রানী বলেন, ‘যাদের ধরা হয়েছে, তারা আমাদের প্রতিবেশী। তাদের কেউ স্বর্ণের দোকানে, কেউবা কাপড়ের দোকানে কাজ করত। বাসার পুরুষ সদস্যদের কাছে শুনেছি ওই ছেলেগুলো মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিল। পাশাপাশি চুরি-ছিনতাইও করত। অতিরিক্ত মাদক সেবনের জন্য তারা এমন ঘটনা ঘটাতে পারে।’তারা বলেন, ‘এ এলাকাটির অলিগলিতে মাদক বিক্রি হয়। অনেকেই মাদক সেবন করেন। একসময় স্থানীয় মন্দিরের বাউন্ডারির ভেতরে মাদক সেবন করার কারণে এখন বড় ফটক লাগিয়ে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
একই এলাকার কান্তপাল এবং শুভাস চন্দ্র দাস বলেন, সীমান্তবর্তী চোরাপথ দিয়ে আসা মাদকের সহজলভ্যতার কারণে মাছুয়াপাড়ায় প্রকাশ্যে কেনাবেচা চলত এবং স্থানীয় মাদক বিক্রেতা কুশির দাসের কাছ থেকে মাদক কিনে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নিয়মিত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে বসে সেবন করত। বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদাবাজি করা এবং পরে ছাদে মাদক সেবনে শিক্ষকের বারবার নিষেধের ফলেই নিহত পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্তদের শত্রুতার সৃষ্টি হয়।
মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরতী এলাকা থেকে আসা ফুলমতি গণপতি মাস্টারের প্রতিবেশী পিসি বলেন, ‘নিহত গণপতি মাস্টার কয়েক বছর আগে মাছুয়াপাড়ায় জমি কিনে বাড়ি করেছেন। আমরা শুনেছি, বাড়ি করার সময় এলাকার ছেলেরা তার কাছে চাঁদা চেয়েছিল এবং প্রায় সময়ই তার বাড়ির ছাদে উঠে নেশা করত। নিষেধ করায় মাস্টারসহ পরিবারের সবাইকে তারা হত্যা করেছে।’ মাছুয়াপাড়া সংলগ্ন তুলার মিল পূর্ব কামাল কাচনা এলাকার বাসিন্দা ইমদাদ ঝুলু বলেন, গ্রেপ্তার সিদ্ধান্ত ও মুগ্ধ মাদকাসক্ত ছিল। হত্যার বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন কথা বলছে।
পুলিশ যা বলছে
এ বিষয়ে রংপুর মেট্রো পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার ডিবির সনাতন চক্রবর্তী আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা সবার সহযোগিতায় দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পেরেছি। তারা চাপমুক্ত থেকে স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে—সে সব তারা স্পষ্ট করে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বলেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আদালত মামলাটি মেট্রোপলিটন ডিবিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এখন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডিবির পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত হোসেন। এছাড়াও নিহতের প্রতিবেশী বিপ্লব কুমার এবং রামনাথ দাসের বাসার সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।’ পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢাকা থেকে হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা আমাদের কাছে এসেছিলেন। আমরা তাদের প্রকৃত ঘটনাটি তুলে ধরে আশ্বস্ত করতে পেরেছি। তারা আমাদের কথায় মুগ্ধ হয়ে পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।’
এ বিষয়ে মেট্রোপুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ আমার দেশকে বলেন, ‘শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী খুন হওয়ার বিষয়টি মাদকের কারণে ঘটেছে—এটা দিবালোকের মতো সত্য। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের দেখানো মতে আমরা বাসা থেকে লুট করা স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছি।’ গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস বলেন, ‘তারা মাদক সেবন করত কি না আমার জানা নেই।’ এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ, সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল সোমবার বিক্ষোভ ও শোক র্যালি করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে (১২) নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রাতেই লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। তার মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। ছেলে প্রিয়ম ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
খবর- আমার দেশ