Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৪৮ মিনিট আগে
  • ৯ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

রেকর্ড তাপপ্রবাহ, মাটির নিচেই ‘সেদ্ধ’ হচ্ছে আলু!

 রেকর্ড তাপপ্রবাহ, মাটির নিচেই ‘সেদ্ধ’ হচ্ছে আলু!

অনলাইন ডেস্ক ►
এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রেকর্ড তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন ও কৃষি। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকংয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তীব্র গরমে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি এলাকায় তীব্র তাপে মাটির নিচে আলু পর্যন্ত ‘সেদ্ধ’ হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিউল থেকে ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে গ্যাংওন প্রদেশের ইয়াংগু কাউন্টির একটি আলুখেতে গিয়ে লি সাং-হিউক মাটিতে হাত দিয়ে দেখেন, সংরক্ষণ করার মতো প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ক্ষেতের আলুগুলো ভালোই ছিল। কিন্তু এখন মাটি খুঁড়ে পাওয়া আলুগুলো নরম হয়ে ধসে পড়ছে—অনেকটা সেদ্ধ আলুর মতো।

স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে লি বলেন, ‘এটা শুধু একটি-দুটি ক্ষেতের ঘটনা নয়। আমি কীভাবে এর বর্ণনা দেব? এটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।’ তার নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল পূর্ব এশিয়াজুড়ে চলমান ভয়াবহ গ্রীষ্মের একটি চিত্রমাত্র। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকংয়ে রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা গেছে।

গত ২ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১৯০৪ সালে আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর দেশটিতে এটিই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে চাষ করা প্রায় ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে কর্তৃপক্ষ সতর্কতা জারি করে মানুষকে ‘অবিলম্বে সব ধরনের বাইরের কার্যক্রম বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, এমন চরম আবহাওয়া ‘এর আগে আমরা যা দেখেছি, তার সঙ্গে কোনোভাবেই তুলনীয় নয়’। তিনি বলেন, ‘এই চরম আবহাওয়া যখন নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে, তখন জাতীয় সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।’ প্রতিবেশী জাপানের একাধিক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছে। দেশটিতে এ বছর প্রথমবারের মতো ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুরভাবে গরম দিন’ নামে নতুন একটি শ্রেণি চালু করা হয়েছে, যা ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। তীব্র গরমে টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনটি সিংহের মৃত্যু হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চরম তাপমাত্রা বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তনের অংশ। জাপানের ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন সেন্টারের গবেষকরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া দেশটিতে জুলাইয়ের এমন তীব্র তাপপ্রবাহ ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল। তাদের হিসাব অনুযায়ী, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না থাকলে এমন মাত্রার তাপপ্রবাহ গড়ে ১০ হাজার বছরে একবার ঘটতে পারত।

হংকংয়েও রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা গেছে। শহরটির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে, যা ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর সর্বোচ্চ। টাইফুন ডলফিনের বাইরের অংশ শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় গরম বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় এই তাপমাত্রা তৈরি হয়।

তবে রেকর্ড তাপমাত্রার মধ্যেও বাইরের শ্রমিকদের জন্য হংকংয়ের তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকি সতর্কতা ব্যবস্থা সর্বনিম্ন স্তরেই ছিল। এ নিয়ে সমালোচনা করেছেন হংকং অবজারভেটরির সাবেক প্রধান ল্যাম চিউ-ইং। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘লাল সতর্কতা জারির সীমা স্পষ্টতই অনেক বেশি। রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রাও যদি এটি সক্রিয় করতে না পারে, তাহলে এটি কি শুধু দোকানের জানালা সাজানোর প্রদর্শনী?’ এরপর হংকংয়ের শ্রম বিভাগ জানিয়েছে, তারা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে সতর্কতা ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করছে।

চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াংয়ে জুলাইয়ে একটি আবহাওয়া কেন্দ্র ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটানা কয়েক রাত তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি। পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী ও জাতিসংঘের সর্বশেষ জলবায়ু মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সমন্বয়কারী প্রধান লেখক জুন-ই লি বলেন, বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের বিভিন্ন ধরন এবং উষ্ণায়ন—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে এ অঞ্চলের তাপপ্রবাহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

তার মতে, তিব্বত মালভূমি ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর উচ্চচাপ বলয় শক্তিশালী হওয়া এবং এ বছরের এল নিনোর প্রভাবে তীব্র গরমের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এশিয়ায় উষ্ণায়নের গতি তার আগের ৩০ বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

সিউল থেকে প্রায় ২৫৭ কিলোমিটার দক্ষিণে গ্যাংজু শহরে তরমুজচাষি হং কিয়ং-হি এমন ফল দেখেছেন, যেগুলো সাধারণত ভালো দামে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তীব্র গরমে সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে।

কোরিয়ান সম্প্রচারমাধ্যম কেবিএসকে তিনি বলেন, ‘ভেতরটা ভালো ছিল, মিষ্টিও ঠিক ছিল, সবকিছুই ভালো ছিল। কিন্তু তিন দিন পর রাতারাতি এভাবে নষ্ট হয়ে গেল। ৫০ বছরের কৃষিজীবনে এমন ঘটনা এই প্রথম দেখলাম।’ দক্ষিণ জিওল্লা প্রদেশের দামইয়াং কাউন্টির স্ট্রবেরিচাষি ইউন উ-হাও তিন মাস ধরে পরিচর্যা করা চারাগাছ হারিয়েছেন। কিন্তু তার এই ক্ষতি বীমার আওতায় পড়বে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষি বীমা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু ফসল, চাষপদ্ধতি ও অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সীমার বাইরে ক্ষতি হলে কৃষকদেরই পুরো বোঝা বহন করতে হয়। গোয়াংজু শাখার কোরিয়ান পিজেন্টস লীগের প্রধান লি জুন-কিয়ং বলেন, ‘যখন বীমা এই ক্ষতি বহন করতে পারে না, তখন তা সরাসরি কৃষক পরিবারের ঋণের বোঝায় পরিণত হয়।’

জুন-ই লি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে পরপর তাপপ্রবাহ ও ভারী বৃষ্টির মতো একাধিক চরম আবহাওয়ার ঘটনা একসঙ্গে বা কাছাকাছি সময়ে ঘটার প্রবণতাও বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘আরও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সীমিত করতে দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সুপরিকল্পিত অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

সূত্র: গার্ডিয়ান

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad