
সুন্দরগঞ্জ প্রতিনিধি ►
ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের শব্দে ঘুম নেই চরবাসির। রাত জেগে বসতঘর সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চরবাসি। টানা বর্ষণ এবং ভাঙনের কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন চরের মানুষ। গত তিন দিনের ব্যবধানে ভাঙনে শতাধিক বসতভিটা, তিন শতাধিক একর ফসলি জমিসহ রাস্তাঘাট বিলিন হয়েছে তিস্তার গর্ভে। ভাঙনের মুখে পড়েছে তিন শতাধিক বসতভিটা, শত শত একর ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চন্ডিপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে গত দুই দিন ধরে ভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেই কোনো মাথা ব্যাথা। নাকাওয়াস্তে কয়েকটি স্থানে ভাঙন রোধে ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কখন বসতভিটা নদীগর্ভে বিলিন হবে তা নিয়ে দিশেহারা চরের মানুষ। তিনি বলেন, রাত জেগে বসতঘর সরিয়ে নিচ্ছেন চরবাসি। সারা বছর কমবেশি নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সরকারি ভাবে নদী ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও তা দিয়ে ভাঙন রোধ সম্ভব হচ্ছে না। স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধ করার দাবি চরবাসির।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে প্রতিবছর গড়ে ৫০০ বসতভিটা, ৬০০ হেক্টর ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠান তিস্তায় বিলিন হয়ে যাচ্ছে। সে মোতাবেক গত ৫ বছরে আড়াই বসতভিটা, তিন হাজার হেক্টর ফসলি জমি, ৫০ কিলোমিটার রাস্তাঘাট, ৩০টি ধর্মীয় ও ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে ভাঙন কবলিত পরিবারের জন্য ত্রান বিতরণ করা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি।
হরিপুর ইউনিয়নের কানি চরিতাবাড়ি গ্রামের মো. আবুল কাশেম মিয়া বলেন, গত তিন দিন ধরে ভারী বর্ষণের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে গেছে। চরের প্রতিটি মানুষের বসতভিটা কমপক্ষে ৫ হতে ৮ বার ভাঙনের শিকার হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে সারা বছর নদী ভাঙন চলমান রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। চরবাসিকে শান্তনা দেয়ার জন্য সরকারি ভাবে ভাঙন রোধে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙন বন্ধ হচ্ছে না।
কছিম বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল হক বলেন, অনেক আগেই তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। সেই কারণে তিস্তা অসংখ্য শাখা নদীতে রুপ দিয়েছে। যার জন্য সময় এবং অসময়ে নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধ করতে না পারলে চরের মানুষের কষ্ট কোনো দিন দুর হবে না।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বলেন, গত তিন দিন ধরে কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, ফুলমিয়ার মোড়, উজান বোচাগাড়ি, ভাটি বোচাগাড়ি এলাকায় ব্যাপক আকারে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নিমেষের মধ্যে ফসলি জমি, বসতভিাটা, গাছপালা, রাস্তাঘাট নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। সরকারি ভাবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নদী ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর কষ্টের সীমা নেই। তার ইউনিয়নের সবগুলো ওয়ার্ড নদীর চরে।
কাপাশিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে তাঁর ইউনিয়নের কানিচরিতাবাড়ি গ্রামে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদী খনন, ড্রেজিং, সংরক্ষণ, মেরামত এবং শাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। নদী খনন ও ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ একমুখি করলে নদী ভাঙন কমে যাবে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জিও টিউব ও জিও ব্যাগ এখন কোনো কাজে আসছে না। চরের মানুষের হা-হাকার দুর করতে হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি সরকারের ওপর মহলের নিকট জোর দাবি জানান। তা না হলে এই উপজেলার মানচিত্র পরিবর্তন হয়ে যাবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে কাপাসিয়া, হরিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। চেয়াম্যানদের নিকট হতে তালিকা চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ সাপেক্ষে বিতরণ করা হবে। এছাড়া সরকারি ভাবে কোনো সুযোগ নেই।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, স্থায়ী ভাবে ভাঙন রোধ সরকারের ওপর মহলের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এখানে তাদের করার কিছুই নাই। নদীভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব, জিও ব্যাগ ফেলা এবং সরকারের ওপর মহলে তথ্য প্রদান ছাড়া আর কোনো কাজ নেই তাদের। নদী খনন, ড্রেজিং, শাসন এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান বলেন, বেশ কয়েকটি চরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিনি পরিদর্শন করে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছেন। আপাতত পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ হতে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।