
সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর►
দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লিচু বাগানগুলো এখন লাল-টুকটুকে পাকা লিচুতে ভরপুর। গাছে গাছে ঝুলছে রসালো বেদানা, মাদ্রাজি ও চায়না-৩ জাতের লিচু। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানে চলছে লিচু সংগ্রহের ব্যস্ততা। নারী-পুরুষ শ্রমিকরা গাছ থেকে লিচু পেড়ে ৫০টি করে একসঙ্গে বেঁধে আঁটি তৈরি করছেন। কেউ আঁটি গুছিয়ে ঝুড়িতে রাখছেন, কেউ আবার ভ্যানে ও ট্রাকে সাজিয়ে পাঠাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে। লিচুর রাজধানীখ্যাত দিনাজপুরে এখন যেন মধুমাসের উৎসব। জেলার কালিতলা, পুলহাট, সিকদারহাট, মহব্বতপুর, উলিপুর, মাসিমপুর, আউলিয়াপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠেছে লিচুর পাইকারি ও খুচরা বাজার। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে বাগান ও আড়ত থেকে লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের কালিতলা নিউমার্কেট ও পুলহাটের পাইকারি বাজারে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে লিচুর বেচাকেনা। ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে বাজারগুলো। কোথাও দরদাম চলছে, কোথাও ট্রাকে লিচু বোঝাই করা হচ্ছে। অনেক ক্রেতা লিচুর স্বাদ পরীক্ষা করে পছন্দমতো লিচু কিনছেন। সদর উপজেলার সিকদার গ্রামের লিচু বাগান মালিক মকসেদ আলী বলেন, “দিনাজপুরের উন্নতমানের লিচুর চাহিদা প্রতিবছরই থাকে। এবারও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে লিচু কিনছেন। আমরা যত্নসহকারে লিচু সংগ্রহ করে বাঁশের ঝুড়িতে প্যাকেটজাত করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছি।
সদর উপজেলার মহব্বতপুরের লিচু চাষি মো. আব্দুল হান্নান বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। বাজার দরও সন্তোষজনক। শুরু থেকেই পাইকারদের চাপ থাকায় বাগান থেকেই অনেক লিচু বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আশা করছি মৌসুম শেষে ভালো লাভ হবে। বর্তমানে বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও চায়না-৩ জাতের লিচু পাওয়া গেলেও বোম্বাই, কাঁঠালি, হারিয়া, মোজাফরি ও চায়না-২,চায়না-৩ জাতের লিচু বাজারে আসতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। তবে বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কায় অনেক চাষি নির্ধারিত সময়ের আগেই লিচু সংগ্রহ শুরু করেছেন।
কালিতলা নিউমার্কেটে প্রতি ১০০টি মাদ্রাজি লিচু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বেদানা লিচু ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং চায়না-৩ লিচু ৮০০ থেকে ৯০০,চায়না -৪ জাতের লিচু ১৬০০ টাকা থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের কারণে বাজারে দাম কিছুটা বেশি রয়েছে। লিচুর আড়তদার ও ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ বলেন, দিনাজপুরে উৎপাদিত প্রায় ৮০ শতাংশ লিচু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। মাত্র ২০ শতাংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। ফলে মৌসুমজুড়ে দেশের অন্যতম বড় ফলের বাজারে পরিণত হয় দিনাজপুর।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফজল হোসেন বলেন , চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৭ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। উৎপাদন ও বাজারদর অনুকূলে থাকায় এবার লিচু বিক্রি থেকে জেলার চাষিরা ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার আয় করতে পারবেন। তিনি আরোও বলেন, দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বেদানা লিচু ইতোমধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে এই লিচু বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।