
অনলাইন ডেস্ক►
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন নাটকীয় মোড় শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবি এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের অবস্থানকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিকভাবে চরম সংকটের মুখে রয়েছে এবং দেশটি ‘ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে’ দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান নিজেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস।
মঙ্গলবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, নেতৃত্বের সংকটে থাকা ইরান নিজেদের পরিস্থিতি সামাল দিতেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই নমনীয় বার্তা দিয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এই সুনির্দিষ্ট দাবির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি প্রতিনিধি আমির সাইদ ইরাভানি অবশ্য স্থিতিশীলতার জন্য উল্টো শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ফেরাতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (খঘএ) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। ইরান এই প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আরোপিত চাপ কমানোর প্রস্তাব দিলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাতে সন্তুষ্ট নয়। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, মার্কিন অবরোধের প্রভাবে ইরানের তেল উৎপাদন ব্যবস্থা অচিরেই ধসে পড়বে এবং দেশটিতে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেবে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে নিজেদের ইস্পাত শিল্প বাঁচাতে ২৬ এপ্রিল থেকে সব ধরনের ইস্পাত পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে ইরান।
উত্তেজনার মধ্যেই একটি ব্যতিক্রমী ও কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। রুশ ধনকুবের আলেক্সেই মোর্দাসোভের মালিকানাধীন বিলাসবহুল সুপারইয়ট ‘নর্ড’ কোনো বাধা ছাড়াই অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। প্রায় ৫০ কোটি ডলার মূল্যের এই নৌযানটি দুবাইয়ে মেরামত শেষে রাশিয়ার পতাকা উড়িয়ে যাত্রা করে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইন মেনে চলায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান-কোনো পক্ষই এই চলাচলে হস্তক্ষেপ করেনি, যা বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একটি বিরল ঘটনা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও পারদ চড়ছে। জাতিসংঘে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানকে সহসভাপতি করার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার ইয়াও একে এই চুক্তির প্রতি ‘অপমান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, আইএইএ-তে নিযুক্ত ইরানি প্রতিনিধি রেজা নাজাফি মার্কিন বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সময়ে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন যে, ওয়াশিংটনের অত্যধিক দাবির কারণেই শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি ঘোষণা। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ১ মে থেকে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক (ঙচঊঈ) ও ওপেক প্লাস ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। এছাড়া ইরাকেও বড় ধরনের রাজনৈতিক রদবদল ঘটেছে। মার্কিন চাপে ইরানঘেঁষা হিসেবে পরিচিত নুরি আল-মালিকিকে সরিয়ে ব্যবসায়ী আলী আল-জাইদিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করা হয়েছে। এদিকে, চলমান সংকট নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে কাতার।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও পরিস্থিতি শান্ত নেই। ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের ১৬টি গ্রামের বাসিন্দাদের অতিদ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই সংঘাতের জন্য হিজবুল্লাহর দিকে আঙুল তুললেও লেবাননের পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটি ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় গত এক বছরে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর বনভূমি ও বিশাল কৃষি অঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, যাকে ‘ইকোসাইড’ বা বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষি ও অবকাঠামো মিলিয়ে লেবাননের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ডলারে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এবং সংলগ্ন অঞ্চলটি এখন এক দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হতে পারে।