
অনলাইন ডেস্ক ►
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের প্রভাব তাদের নিজেদের গানের সংখ্যা কিংবা জনপ্রিয়তার চেয়েও অনেক বড়। নিলয় দাশ তেমনই এক নাম। গিটার হাতে তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, সেই পথ ধরেই বাংলাদেশের বহু গিটারিস্ট পরবর্তী সময়ে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছেন। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আজকের প্রজন্মের বড় একটি অংশের কাছে তার নামও যেন ক্রমেই অপরিচিত হয়ে উঠছে।
গতকাল, ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল এই গুণী গিটারিস্টের জন্মদিন। ১৯৬১ সালের এই দিনে জন্মেছিলেন নিলয় দাশ। গিটারিস্টের পাশাপাশি তিনি ছিলেন গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও শিক্ষক। ২০০৬ সালে মারা যান এই শিল্পী। তার মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পরও বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে তার প্রভাবের কথা বারবার উঠে আসে। প্রয়াত কিংবদন্তি গায়ক ও গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চু একবার নিলয় দাশ সম্পর্কে বলেছিলেন, তার মতো করে বাংলাদেশে আর কেউ গিটার বাজাতে পারেননি।
তাঁর ভাষায়, নিলয় ছিলেন দেশের একমাত্র নিও-ক্ল্যাসিক্যাল গিটারিস্টদের একজন। নিলয়কে হারানো প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ওকে হারিয়েছে বা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ওর অভিমান থেকে ও চলে গেছে।’
নিলয় দাশের জন্মদিন পেরিয়ে তাকে মনে করার উপলক্ষটি তাই শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিন স্মরণ করা নয়; বাংলাদেশের গিটারচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখারও সুযোগ। আশির দশকে ঢাকার সংগীতাঙ্গনে গিটার শেখা ও বাজানোর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকের সঙ্গেই নিলয় দাশের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল। কেউ তার কাছে সরাসরি শিখেছেন, কেউ তার সঙ্গে বাজিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, আবার কেউ তার বাজানোর ধরন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এ কারণেই সংগীতাঙ্গনে তাঁকে অনেকে ‘গিটারিস্টদের গিটারিস্ট’ বলে মনে করেন।
তৎকালীন ঢাকার অনেক মিউজিশিয়ানের নিয়মিত আড্ডার জায়গা ছিল নিলয় দাশের বাসা। সেখানে গিটার নিয়ে বসতেন তারা, গান হতো, আলোচনা হতো বিভিন্ন ধরনের সংগীত নিয়ে। নিলয় তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন রক, কান্ট্রি, জ্যাজ, ব্লুজ থেকে শুরু করে ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল ও স্প্যানিশ ফ্ল্যামেনকোর নানা দিক। বিশ্বসংগীতের প্রতিও তার ছিল গভীর আগ্রহ। হার্ড রক ও হেভি মেটাল থেকে শুরু করে ক্ল্যাসিক্যাল ও নিও-ক্ল্যাসিক্যাল—বিভিন্ন ধারার সংগীত তিনি শুনতেন এবং অন্যদেরও সেসবের সঙ্গে পরিচিত করাতেন।
তার গিটার বাজানোর দক্ষতা ছিল আলাদা ধরনের। বিশেষ করে নিও-ক্ল্যাসিক্যাল ও ফ্ল্যামেনকো গিটারে তার দখল ছিল অসাধারণ। সমসাময়িক গিটারিস্ট ওয়ারফেজের কমলও নিলয়ের রিদম গিটারের প্রশংসা করেছেন। তার মতে, নিলয় এমন সব রিদম বাজাতেন, যার তাল ধরাও অনেক সময় কঠিন হয়ে যেত। নিলয় দাশের সংগীতজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে আরেক কিংবদন্তি হ্যাপী আখান্দের নাম। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিলয় প্রথমদিকে নজরুলসংগীত গাইতেন। পরে হ্যাপী আখান্দের পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় গিটারের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
১৯৮১ সালে নিয়মিতভাবে গিটার বাজানো শুরু করেন তিনি। এরপর নিজের চেষ্টাতেই গিটার শেখার পথ তৈরি করেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো গিটার শিক্ষকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নেননি। এক কোরিয়ান গিটারবাদকের কাছ থেকে শুরুতে কয়েকটি কর্ড শেখার পর বাকি পথটা অনেকটাই নিজের চেষ্টায় এগিয়ে নেন। বাখ, মোজার্ট, বিথোভেনের মতো ধ্রুপদি সুরকারদের সংগীত শুনে সেগুলো গিটারে তোলার চেষ্টা করতেন। এভাবেই তৈরি হয় তার নিজস্ব সংগীতভাষা।
বন্ধু হ্যাপী আখান্দের অকালমৃত্যু নিলয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বন্ধুর স্মৃতিকে ধরে রাখতে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হ্যাপী স্কুল অব মিউজিক’। সেখানে গিটার শেখানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেক সংগীতশিল্পীকে সংগীতের নানা ধারার সঙ্গে পরিচিত করে তুলেছিলেন তিনি।
আশির দশকে ঢাকার অভিজাত হোটেলগুলোর সংগীত আয়োজনেও নিলয় দাশ নিয়মিত বাজিয়েছেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সে সময়ের বিভিন্ন ব্যান্ডও হোটেলভিত্তিক সংগীতচর্চায় নিজেদের জায়গা করে নেয়। ‘দ্য জেনমস’ ও ‘ট্রিলজি’—এই দুই ব্যান্ডের সঙ্গে তার কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ট্রিলজি সে সময় ঢাকার সংগীতাঙ্গনে বেশ পরিচিত একটি নাম ছিল। শুধু ব্যান্ডসংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না নিলয়। শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চেও তার ইন্সট্রুমেন্টাল পরিবেশনা শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। গিটার বাজানোর জন্যই সেখানে দর্শকের ভিড় হতো। তার প্রতিভা বুঝতে পেরে তৎকালীন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও সুরকার আজাদ রহমান তাকে সেখানে গিটার শিক্ষক হিসেবে কাজের প্রস্তাব দেন। উপমহাদেশের খ্যাতিমান শিল্পী গোলাম আলী ও মেহেদী হাসানের সঙ্গেও তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন।
১৯৮৮ সালে সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত হয় নিলয় দাশের প্রথম একক অ্যালবাম ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’। ফুয়াদ নাসের বাবুর সংগীত আয়োজনে অ্যালবামটির গান লিখেছিলেন কাউসার আহমেদ চৌধুরী, আহমেদ ইউসুফ সাবের ও আসিফ ইকবাল। অ্যালবামের শিরোনাম গানটি তখন শ্রোতাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। চার বছর পর, ১৯৯২ সালে আশিকুজ্জামান টুলুর সংগীত পরিচালনায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘বিবাগী রাত’। নিলয়ের গানগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গিটার। কণ্ঠের পাশাপাশি তার গিটারওয়ার্কই গানগুলোকে আলাদা মাত্রা দিত। এর বাইরে ‘স্টারস-১’, ‘স্টারস-২’, ‘দেখা হবে বন্ধু’, ‘টুগেদার’, ‘তুমিহীনা সারাবেলা’ ও ‘কেউ সুখী নয়’-এর মতো বিভিন্ন মিক্সড অ্যালবামেও গান করেছেন তিনি। তবে সংখ্যার দিক থেকে তার গানের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়। নিজের কাজ নিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বেছে নেওয়া এবং যত্নশীল।
নিলয় দাশের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল তার প্রচারবিমুখতা। সংগীত নিয়ে যতটা নিবেদিত ছিলেন, নিজেকে আলোচনায় রাখার ব্যাপারে ততটাই অনাগ্রহী ছিলেন। নিভৃত জীবন পছন্দ করতেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে নিয়মিতভাবে নতুন গান প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে সেগুলোর অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এই নিভৃতচারিতাই হয়তো ধীরে ধীরে তাকে মূলধারার স্মৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ২০০৬ সালে তার মৃত্যুর পর কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। এর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত বহুবার বদলেছে, এসেছে নতুন প্রজন্ম, নতুন গিটারিস্ট। কিন্তু তাদের অনেকের সংগীতচর্চার পেছনে নিলয় দাশের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব আজও আলোচিত হয়।
নিলয় দাশের কাছে গিটার কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না; সেটিই ছিল তার সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। তার গিটারসাধনার গভীরতা বোঝাতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় জীবনের শেষ সময়ের একটি ঘটনা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তিনি চিকিৎসককে অনুরোধ করেছিলেন, তার বাম হাতে যেন স্যালাইন না দেওয়া হয়। কারণ, হাতে ব্যথা হলে তিনি গিটার বাজাতে পারবেন না। এই একটি ঘটনাই হয়তো নিলয় দাশকে বোঝার জন্য যথেষ্ট। জনপ্রিয়তার চেয়ে সংগীতের প্রতি তার নিবেদনই ছিল বড়।