
ইউএনবি ►
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১ হাজার ২৫০ নম্বরের মধ্যে ১ হাজার ২২১ নম্বর পেয়ে যশোর বোর্ডের মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে রওনক হাসান। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য—এই ডিজিটাল যুগে এসেও রওনকের নেই কোনো স্মার্টফোন, নেই ফেসবুক অ্যাকাউন্টও। অবসর সময়টা কাটায় সে বই আর খাতার সঙ্গে।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম রমনাথপুর। গ্রামটি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে, গড়াই নদীর ওপারে উপজেলা শহর। সেখানেই অবস্থিত উপজেলার একমাত্র সরকারি বিদ্যালয়—খোকসা জানিপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিদিন বাইসাইকেলে এই পথই পাড়ি দিতেন রওনক হাসান। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। আর সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির পুরস্কারই পেয়েছে সে।
রওনক রমনাথপুর গ্রামের শিক্ষক দম্পতি হাসানুল হাবীব ও রূপালী খাতুনের প্রথম সন্তান। রওনক বলে, ‘আমার কোনো স্মার্টফোন নেই, ফেসবুক অ্যাকাউন্টও নেই। অবসর সময়ে বই পড়তাম। গান গাইতেও ভালো লাগে। শিক্ষকরা এবং বাবা-মা সবসময় পাশে ছিলেন।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিন প্রকৌশল (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং) নিয়ে পড়াশোনা করা তার স্বপ্ন। ছেলেটির ভাষ্য, সে নিয়মিত ৫-৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করত। প্রাইভেট-কোচিংয়েও খুব একটা পড়েনি। তবে স্কুল কামাই করত না সাধারণত।
রওনকের সফলতায় গর্বিত বাবা-মা
রওনকের মা রূপালী খাতুন রমনাথপুর মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। বাবা হাসানুল হাবীব কুমারখালীর ডাঁসা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক। সন্তানের সাফল্যে তারা আজ গর্বিত। বাবা বলেন, ‘সে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী। মোবাইল-ফেসবুকের দিকে ঝোঁক ছিল না। আমরা শুধু পাশে থেকে সাহস দিয়েছি। ওর এই সাফল্য আমাদের এলাকার জন্য গর্বের।’
মা বলেন, ‘রওনক খুবই অনুগত। তাকে কখনও পড়ার কথা বলা লাগে না। প্রতিদিন নিজের ইচ্ছামতো ৫-৬ ঘণ্টা নিয়মিত পড়াশোনা করত সে।’‘ভেবেছিলাম সে পরীক্ষায় ভালো করবে। তবে বোর্ডের দ্বিতীয় হবে তা কল্পনার বাইরে ছিল,’ বলেন রূপালী খাতুন। সেই সঙ্গে ছেলেও ভবিষ্যত সাফল্য কামনায় সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
স্কুলের গর্ব রওনক
১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী খোকসা জানিপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো শিক্ষার্থী বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান করে নিল। এতে গর্বিত স্কুলের শিক্ষকরাও। চলতি বছর ১৭৭ জনের মধ্যে ১৬৫ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ২০ জন। গত রবিবার কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন খোকসা পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মো. রিপন হোসেন।
সহকারী শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রওনক খুবই মেধাবী ও পরিশ্রমী। ক্লাসে নিয়মিত ছিল। কোনোদিন পড়া ফাঁকি দেয়নি। গড়াই নদীর ওপারের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত। ওর সাফল্য আমাদের স্কুলের জন্য মাইলফলক।’ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘১২৫০ নম্বরের মধ্যে ১২২১ নম্বর পেয়ে যশোর বোর্ডে দ্বিতীয় হয়েছে রওনক। তার এই সাফল্য আমাদের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। আমরা চাই রওনকের মতো আরও অনেকে এগিয়ে আসুক।’
প্রতিকূলতা জয়ের গল্প
খোকসা পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মো. রিপন হোসেন বলেন, ‘প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্পের নাম রওনক হাসান। প্রযুক্তির বাড়াবাড়ি নেই, আছে শুধু স্বপ্ন। বিলাসিতা নেই, আছে শুধু কঠোর পরিশ্রম। এমনসব ছেলেমেয়েদের উৎসাহ দিতেই রওনকসহ কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।’
যশোর বোর্ড ও জেলায় দ্বিতীয় এবং খোকসায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে রওনক হাসান। এ তথ্য জানিয়ে খোকসা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘৫ কিলোমিটার সাইকেল চালানো সেই ছেলেটি আজ প্রমাণ করলো যে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। খোকসার রওনক এখন শুধু একটি নাম নয়, সে অনুপ্রেরণা। সে প্রমাণ করেছে—গ্রাম থেকেও আকাশ ছোঁয়া যায়।’