
মানুষ জন্মগতভাবে মত নিয়ে জন্মায় না; জন্মায় সম্ভাবনা নিয়ে। পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি এবং অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে সে মত গঠন করে। কিন্তু আদর্শের উৎস আরও গভীরে-মানুষের বিবেক, নৈতিকতা, সত্যের অন্বেষণ এবং মানবকল্যাণের আকাক্সক্ষায়। এই কারণেই বলা যায়, মত মানুষকে পরিচয় দেয়, কিন্তু আদর্শ মানুষকে মর্যাদা দেয়। আমরা প্রায়ই মতাদর্শ শব্দটি এমনভাবে ব্যবহার করি যেন মতই আদর্শের জন্ম দেয়। অথচ বাস্তবতা তার উল্টোও হতে পারে। আদর্শ যদি মানবিক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে মত হবে সেই আদর্শ বাস্তবায়নের বিভিন্ন পথ মাত্র। পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু গন্তব্য যদি মানবকল্যাণ হয়, তবে মতের বৈচিত্র্য বিভেদের নয়, সমৃদ্ধির কারণ হয়ে ওঠে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় সংঘাতগুলো কেবল মতভেদের কারণে ঘটেনি। মানুষ যুগে যুগে ভিন্নমত পোষণ করেছে, এবং সেই ভিন্নমত থেকেই জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে তখনই, যখন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র নিজের মতকে একমাত্র সত্য এবং অন্য সব মতকে অস্বীকারযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। মত তখন আর সংলাপের বিষয় থাকে না; তা ক্ষমতার অস্ত্রে পরিণত হয়। ধর্মীয় ইতিহাসে যেমন এই প্রবণতা দেখা যায়, তেমনি রাজনৈতিক মতাদর্শের ইতিহাসেও। জাতীয়তাবাদ, সাম্যবাদ, পুঁজিবাদ, বর্ণবাদ কিংবা ধর্মীয় মৌলবাদ-যখনই নিজেকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তখনই মানবতার চেয়ে মত বড় হয়ে উঠেছে।
ফলে মানুষ মানুষকে নয়, মতকে ভালোবেসেছে; বিবেককে নয়, পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়-মতাদর্শের ভিত্তি যদি মত হয়, তবে বিভাজনের সম্ভাবনা থেকেই যায়। কিন্তু মতাদর্শের ভিত্তি যদি আদর্শ হয়, তবে ভিন্নমতও পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং সহযাত্রী হতে পারে। আদর্শভিত্তিক মতাদর্শের প্রথম শর্ত হলো সত্যের প্রতি বিনয়। সত্য এত বিশাল যে কোনো ব্যক্তি, দল বা দর্শন একে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারে না। তাই ভিন্নমতকে শত্রু নয়, সত্যের অন্য একটি সম্ভাব্য জানালা হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তিও এখানেই-এটি মতের জয় নয়, মতের সহাবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা। দ্বিতীয় শর্ত হলো মানবমর্যাদার সর্বজনীন স্বীকৃতি। মানুষ কোনো মতের জন্য জন্মায় না; মত মানুষের জন্য সৃষ্টি হয়। তাই যে মত মানুষকে অপমান করে, মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, অথবা মানুষকে কেবল একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে, সে মত যত আকর্ষণীয়ই হোক, তা আদর্শভিত্তিক হতে পারে না। তৃতীয় শর্ত হলো ন্যায়বিচার। ন্যায় এমন একটি আদর্শ যা দল, ধর্ম, জাতি ও রাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করে। ন্যায় যদি সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়, তবে তা আর আদর্শ থাকে না; তা সুবিধাবাদের ভাষায় পরিণত হয়।
চতুর্থ শর্ত হলো সহমর্মিতা। সভ্যতার অগ্রগতি কেবল প্রযুক্তির উন্নতিতে নয়; মানুষের হৃদয়ের প্রসারণেও। সহমর্মিতা মানুষকে শেখায়-প্রতিপক্ষও একজন মানুষ, যার আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাক্সক্ষা আমার মতোই বাস্তব। এই আদর্শগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শ কখনো মানুষকে একরকম হতে বাধ্য করবে না। বরং স্বীকার করবে যে বৈচিত্র্যই প্রকৃতির নিয়ম। একটি বাগান যেমন একটিমাত্র ফুলে সুন্দর হয় না, তেমনি একটি সভ্যতাও একটিমাত্র মত দিয়ে পূর্ণতা পায় না। নানা রঙ, নানা ভাষা, নানা বিশ্বাস ও নানা চিন্তার সমন্বয়েই মানবসভ্যতার সৌন্দর্য। আজকের বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তথ্যযুদ্ধ মানুষের মধ্যে মতের বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষ অনেক সময় যুক্তির আগে পরিচয়, সত্যের আগে পক্ষ এবং মানবতার আগে মতকে গুরুত্ব দেয়। এই প্রবণতা সভ্যতার জন্য বিপজ্জনক। এর প্রতিষেধক নতুন কোনো মতাদর্শ নয়; বরং আদর্শকেন্দ্রিক একটি নৈতিক জাগরণ। এই জাগরণ আমাদের শেখাবে-আমি আমার মতকে ভালোবাসতে পারি, কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন অন্যের মর্যাদাকে অস্বীকার না করে। আমি আমার বিশ্বাসকে ধারণ করতে পারি, কিন্তু সেই বিশ্বাস যেন আমাকে অহংকারী না করে। আমি আমার আদর্শে দৃঢ় থাকতে পারি, কিন্তু সেই দৃঢ়তা যেন আমাকে সংলাপ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে।
সম্ভবত ভবিষ্যতের পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের নতুন রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি নতুন নৈতিক দর্শন। সেই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হবে-মানুষ। মত হবে তার প্রকাশের মাধ্যম, আদর্শ হবে তার প্রাণশক্তি, আর মানবতা হবে তার চূড়ান্ত পরিচয়। তাই আমাদের সময়ের নতুন আহ্বান হতে পারে- মত থেকে নয়, আদর্শ থেকে মতাদর্শের জন্ম হোক। কারণ মত পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সত্য, ন্যায়, করুণা, স্বাধীনতা ও মানবমর্যাদার আদর্শই মানবসভ্যতার স্থায়ী ভিত্তি। মত মানুষকে বিভক্ত করতে পারে; আদর্শ মানুষকে একত্রিত করে। এই উপলব্ধিই হয়তো আগামী বিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দার্শনিক ভিত্তি-আদর্শ হবে মতের ভিত্তি, আর সেই আদর্শের কেন্দ্র হবে মানবতা।
► লেখক- কে এম জয়নুল আবেদীন (শাহানশাহ),
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার-পাবলিক ওয়ার্কস,
ঢাকাস্থ গাইবান্ধাবাসী।
ফোন : ০১৭১১৫২৯১১৭