Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ১ ঘন্টা আগে
  • ১৫ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

ফের উত্তপ্ত মিয়ানমার সীমান্ত বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক

ফের উত্তপ্ত মিয়ানমার সীমান্ত বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক

অনলাইন ডেস্ক ►
এক বছরের বেশি সময় পর ফের কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নাফ নদের পূর্ব ও দক্ষিণাংশে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার থেকে দফায় দফায় বিস্ফোরণের বিকট শব্দ আসছে। এতে সীমান্তে এপারে বসবাসরত বাংলাদেশি মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে অনবরত ভেসে আসা গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে এপারের সাধারণ মানুষ তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ও দৈনন্দিন জীবিকার প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও নেটংপাড়া সীমান্ত এলাকা ঘুরে থমথমে পরিস্থিতি দেখা গেছে। সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জেলেরা সতর্কতার সঙ্গে নাফ নদে মাছ ধরছেন। সীমান্তজুড়ে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অতিরিক্ত টহল চোখে পড়েছে। সীমান্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তে (আকিয়াব) থেকে যুদ্ধবিমান উড়ে এসে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের মংডুতে আরাকান আর্মির অবস্থানে হামলা চালিয়ে ফিরে যাচ্ছে। প্রতিবার একসঙ্গে পাঁচ থেকে ছয়টি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় নাফ নদের এপারে ঘরবাড়িও কেঁপে উঠছে।

স্থানীয় পৌরসভার বাসিন্দা হাফেজ এনামুল হাসান বলেন, রাত থেকে থেমে থেমে বিকট শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে। শোনা গেছে মুহুর্মুহু গোলাগুলির শব্দ। টেকনাফের নাইথ্যাংপাড়া পৌরসভার জালিয়াপাড়া, পল্লানপাড়া, নাফ নদের পূর্ব পাশে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসে। আমরা সীমান্তের বাসিন্দারা আতঙ্কে আছি।শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, হঠাৎ ভয়াবহ ঝাঁকুনি অনুভব করি। মনে করছি কোনো ভূমিকম্প হয়েছে। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠছে। পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদের ওপারে আগুনের লেলিহান শিখাও দেখা গেছে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আগুনের ঝলক আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। বিস্ফোরণটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হয়েছে।

গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে মর্টারশেল ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আরাকান আর্মির দখলে থাকা রাখাইন রাজ্যে আবার হামলা শুরু করেছে মিয়ানমার সরকার। গতকাল সকালে জান্তা সরকার রাখাইনে বুথে এলাকায়ও বিমান হামলা চালায়। টেকনাফের দক্ষিণাংশের সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, রাত থেকে ভোর পর্যন্ত থেমে থেমে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পান তারা। বিকট শব্দে মাঝেমধ্যে মাটি কেঁপে উঠেছে।

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আবুল ফয়েজ বলেন, নাফ নদের পূর্ব ও দক্ষিণাংশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। যেসব স্থান থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসছে, সেখানে রাখাইন রাজ্যের মংডুর শহরের আশপাশের মেগিচং, কাদিরবিল, নুরুল্লাহপাড়া, মাংগালা, নল বন্ন্যা, ফাদংচা ও হাসুরাতা এলাকা অবস্থিত। এসব এলাকায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) কয়েকটি নিরাপত্তাচৌকি রয়েছে, সম্ভবত সেই চৌকিকে ঘিরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীরা হামলা চালিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পরশু রাত থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত থেমে থেমে মিয়ানমারের মংডু শহরের আশপাশে প্রচুর গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। তবে সকাল থেকে কোনো ধরনের শব্দ শোনা যায়নি। গতকাল সকাল থেকে কিছুটা শান্ত থাকলেও স্থানীয় লোকজন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। সংঘাত আরও বাড়লে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা শুরু হতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানান তিনি।

টেকনাফ নয়াপাড়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের নেতা মো. জামাল হোসেন জানান, স্থলপথে আরাকান আর্মির সঙ্গে তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ চলছে। হামলায় বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। তিনি আশঙ্কা করেন, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয়ের চেষ্টা করতে পারে।

উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বুধবার রাতে মিয়ানমারের মংডু শহরের আশপাশে প্রচুর গোলাগুলি শব্দ শোনা যায়। তবে সকাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো ধরনের শব্দ শোনা যায়নি। এগুলো তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, এখানে আমাদের স্থানীয় বসবাসকারী যারা জেলেরা রয়েছেন, সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি এবং আমাদের সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে সীমান্তে কাজ করছে। রোহিঙ্গা যেন কোনোভাবেই অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি তিনি অনুরোধ জানান।

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, হঠাৎ টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিকট শব্দ ও গোলাগুলির খবর তারা পেয়েছেন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে দুটি গ্রুপের মধ্যে থেমে থেমে কয়েক দিন ধরে টেকনাফ সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়েছেন সীমান্তে থাকা বিজিবির সদস্যরা। সীমান্তে যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিজিবির সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্কের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছি। তবে প্রাথমিকভাবে জেনেছি শাহপরীর দ্বীপ থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলি চলছে। সীমান্ত পরিস্থিতি কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদে অতিরিক্ত টহল দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত সীমান্তে গুলি এসে পড়া বা অনুপ্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানোর হয়েছে। সীমান্তে বসবাসরত মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর টানা ১১ মাসের যুদ্ধের পর আরাকান আর্মি মংডু, বুথিডং, রাথেডংসহ রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে রাজধানী সিত্তে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিমান হামলাগুলো সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে বলে সীমান্ত সূত্র জানিয়েছে।

মিয়ানমারভিত্তিক কয়েকটি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুথিডং টাউনশিপের একটি মুসলিম গ্রামে বিমান হামলায় হতাহতের পাশাপাশি অন্তত ১০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে ১৭ ও ২৪ জুনও মংডু ও কিয়াউকতাও এলাকায় পৃথক বিমান হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad