
অনলাইন ডেস্ক ►
সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তিকে ইরান নিজের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না এবং বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলেও তেহরান উদ্বিগ্ন হবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রাহিমি জাহানাবাদী। আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এই মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, যখন আপনাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কথা আসে, আমরা খুব ভালো করেই জানি যে আপনাদের সরকার একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে চলছে। ফলে আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই ইরানের জন্য উদ্বেগের সৃষ্টি করবে না।
তিনি বলেন, আমরা মক্কা শান্তি চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে মনে করি না। বাংলাদেশের যেকোনো সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে না। দূত জানান, ইরান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত মূল্যায়ন করে এবং রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করতে গভীরভাবে আগ্রহী। সৌজন্য সাক্ষাতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির আশা প্রকাশ করেন যে—এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা খুব শিগগিরই প্রশমিত হবে এবং সেখানে একটি স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
ইরানি রাষ্ট্রদূতের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমঝোতাগুলো প্রমাণ করে যে—আঞ্চলিক দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার চেয়ে স্বাবলম্বী হওয়াকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই শান্তি চুক্তিটি একটি বড় প্রমাণ যে আঞ্চলিক দেশ ও এর সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এটি প্রমাণ করে যে তারা তাদের নিরাপত্তার জন্য আর আমেরিকার ওপর নির্ভর করতে চান না।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে—আঞ্চলিক দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি সেই দেশগুলোর নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই বহিরাগত পরাশক্তিদের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক দেশগুলোর উচিত নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই নেওয়া।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই উন্নয়নগুলো মূলত দেশগুলোর বৃহত্তর কৌশলগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর এই নতুন নিরাপত্তা সমঝোতা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে কোনো ধরনের হুমকির সৃষ্টি করবে না বলে স্পষ্ট করেন ড. জাহানাবাদী। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে—অন্যদের সঙ্গে কোনো ধরনের দ্বন্দ্বে না জড়িয়েই আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে পারে, ইরান সবসময় এই নীতি সমর্থন করে।
এর আগে গত রবিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছিলেন যে—মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই এবং এটি অন্য অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি অনন্য চুক্তি, যা আমাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাবের কথা ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেছিলেন, মক্কা মূলত বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের অংশগ্রহণে গত ৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এই মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বা মক্কা চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়।গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান—বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলে এই জোটে যোগ দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীরভাবে মূল্যায়ন করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা মক্কা চুক্তিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছি। এই জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে বিবেচনা করা হবে।
তবে বাংলাদেশ এখনও এই জোটে যোগ দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত আমন্ত্রণ পায়নি বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং এর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।