
অনলাইন ডেস্ক ►
ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে বাংলা গান ও সংস্কৃতির প্রসারে অনলাইনে সংগীত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে ছায়ানট। ‘সঙ্গীত-পরিচয়’ নামে ছয় মাসের এই দূরশিক্ষণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঢাকার বাইরের এবং প্রবাসী সংগীতানুরাগীদের জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে গান শেখার সুযোগ তৈরি হল। গতকাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। আয়োজকরা বলছেন, ছায়ানটের এই নতুন উদ্যোগ দেশের সংগীত শিক্ষায় বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অনলাইন পাঠের প্রথম ধাপে ‘সঙ্গীত-পরিচয়’-এর আওতায় লোকসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও সরগম শেখানো হবে। ক্লাস হবে প্রতি রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ছায়ানট জানিয়েছে, বয়সভেদে ‘শিশু-কিশোর’ ও ‘সাধারণ’—এই দুই শাখায় মোট ১২১ জন শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৯৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।
আর দেশের বাইরে উত্তর আমেরিকা থেকে ১২ জন, ইউরোপ থেকে ৭ জন এবং অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে ৯ জনসহ মোট ২৮ জন প্রবাসী যুক্ত হয়েছেন এই অনলাইন সংগীত ক্লাসে। উদ্বোধনী আয়োজনে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা এই উদ্যোগকে একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আসলে ছয় মাসের একটি কোর্সে কতটুকুই বা আমরা শেখাতে পারি? খুব তো বেশি কিছু নয়। খালি এই সংগীত বা সুর মানুষদের সঙ্গে আমাদের একটা সম্পর্ক তৈরি করবে, মনে করি সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে আমাদের দিক থেকে।"
এ বিষয়ে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোভিড মহামারীর সময় অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার অভিজ্ঞতাই তাদের বড় পরিসরে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও শিক্ষকদের কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পর তারা এই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করেছেন। ভৌগোলিক সময়ের পার্থক্যের বিষয়ে লিসা বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের ছুটির দিন বিবেচনায় তারা রোববার বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় ক্লাস রাখায় লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানির মত দেশগুলোর শিক্ষার্থীরাও তাদের দিনের সুবিধাজনক সময়ে যুক্ত হতে পারছেন।
প্রযুক্তির এই যুগে জাতীয় সংস্কৃতি যখন হুমকির মুখে, তখন সংগীত চর্চার মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতিসত্তাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "বিজ্ঞানের যুগে জাতীয় সংস্কৃতির সুরক্ষা ক্রমশ মুছে যেতে বসেছে। ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যম সংগীত রুচিকে যেভাবে চর্চা করে, শুধু প্রবাসে না, বাংলাদেশের মানুষেরও। অথচ যখন দেখুন আপনারা, যে জাতীয় সংস্কৃতির ভিত কিন্তু তারা গিলে গিলে খাচ্ছে।
“কারণ, আপনি রাজনীতি চর্চা করতে পারেন, আপনি রাজনীতি বন্ধ করে দিতে পারেন, কিন্তু তা কি কখনও মুছে দেওয়া যায়? বিশেষ করে যখন আমাদের জাতিসত্তা, আমাদের জাতীয় সংগীত সংস্কৃতির সুশীলদের দ্বারাও বিষয়টি উপেক্ষিত নয়।" সারওয়ার আলী বলেন, "কাজেই আজকে যারা এই অনলাইনে যুক্ত আছ, তাদের কিন্তু এটা মনে রাখা উচিত যে মূলধারার বাংলা গানের চর্চার মধ্য দিয়ে আমার হৃদয়ে বাঙালি হওয়ার যে ঐতিহ্য আমি ধারণ করব, আমি জাতিসত্তাকে জ্ঞাপন করব।
“এই সত্যটি আপনার ভেতরে যে শিকড় ছড়িয়েছে, এটিই বড় পাওয়া। বিজ্ঞানের যুগে এটিকে মূল ভাবনায় মাথায় রাখতে হবে যে ছায়ানট সফলতা পেয়েছে। আকাশপানে তাকাতেই হবে। তথ্যভাণ্ডার তো গড়ে উঠেছে, কিন্তু আমার পদযুগল যেন বাংলার মাটিতে থাকে।" ছায়ানট বিদ্যায়তনের অধ্যক্ষ সেলিনা মালেক চৌধুরী বলেন, “আমার পরিচিত অনেকেই বিদেশ থেকে অনুরোধ করেছিলেন যে এটা করা যায় কিনা, যে অনলাইন শিক্ষাটা উনারা নিতে পারেন কিনা। তখন তো সম্ভব হয়নি, কিন্তু এখন যে সম্ভব হল, এতে আমরা সবাই খুব খুশি।”
অনলাইনে শিক্ষাদানে যুক্ত শিক্ষকদের পক্ষে সংগীতশিল্পী শারমীন সাথী ইসলাম বলেন, “মানুষের মনে একটি ক্ষুধা ছিল যে, আমরা আমাদের বাইরে কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারি, অবশেষে সেই উদোগ নেওয়া হল। এটি আমাদের জন্য পরম আনন্দের দিন।" তিনি জানান, প্রথম ব্যাচে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হওয়া প্রবাসীদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাশিদ জামান, অস্ট্রেলিয়ার প্রিয়াঙ্কা সাহা, জার্মানির হাসিব মাহমুদ এবং যুক্তরাজ্যের ইশরাত বিনতে ওয়াহিদ। দেশের ভেতর থেকে যুক্ত হয়েছেন সিলেটের অর্পিতা দাসগুপ্ত ও লালমনিরহাটের হামিম উর রহমান খান।
এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপ ‘নিবিড় শিক্ষণ’ শুরু হবে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর, যা মূলত অগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত। এই ধাপে গান শেখাবেন শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায় (লোকসংগীত), খায়রুল আনাম শাকিল (নজরুলসংগীত) এবং লাইসা আহমদ লিসা (রবীন্দ্রসংগীত)। প্রতি রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে সোয়া ৭টা পর্যন্ত এই ক্লাস হবে। বর্তমানে এই ধাপের জন্য শিক্ষার্থী নির্বাচনের সাক্ষাৎকার চলছে। এর আগে ২০২০ সালে সন্জীদা খাতুনের তত্ত্বাবধানে ইউটিউবে রেকর্ডেড ভিডিও ‘গানের নিবিড় পাঠ’-এর মাধ্যমে প্রথম দূরশিক্ষণের সূচনা করেছিল ছায়ানট। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর ফেইসবুকে বড় পরিসরে আত্মপ্রকাশের পর এবার পূর্ণাঙ্গ অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম চালু করল প্রতিষ্ঠানটি।