Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ২ ঘন্টা আগে
  • ৪৫ বার দেখা হয়েছে

‘নিঃশ্বাসটা নিয়ে যাও’

‘নিঃশ্বাসটা নিয়ে যাও’

কিরন বালা—ছবি: হেদায়েতুল ইসলাম বাবু।

হেদায়েতুল ইসলাম বাবু►

স্বামী বিদায় নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ বছর আগে। নয় মাস বয়সে চলে গেছে ছেলেটা। রোগে-শোকে ভুগতে ভুগতে তার বাঁচার ভরসা একমাত্র মেয়েটাও মা’কে রেখে পরপারে পাড়ি দিয়েছে। শতবর্ষী কিরনবালার আপন বলতে এখন হাতের লাঠিটাই। লাঠিতে ভর করে দিনের বেলা এবাড়ি-ওবাড়ি দুই চার পা হাঁটতে পারলেও রাতের বেলা চোখে দেখেননা। কারন তার দুচোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় পুরোটাই ঢেকে দিয়েছে ছানি। 

গাইবান্ধা সদরের পোল্লাখাদা গ্রামে শীতের বিকেলে কিরন বালার সাথে দেখা। পরশীরা বলছিলেন- পাকিস্তান আমলে বগুড়া থেকে এই গ্রামে বউ হয়ে আসেন, রুপে-গুনে সংসারজুড়ে আলো ছড়িয়ে দেন কিরন বালা। মুক্তিযুদ্ধের বছর পাঁচেক আগে স্বামী ঝড়ু মোহন্তকে কেঁড়ে নিলো কলেরা। ছেলের পর বুকের ধন মেয়েকে আঁকড়ে ছিলেন। বিয়ের পর অসুস্থ্য হয়ে মেয়ে-জামাই দুজনকেই হারালেন। যা ছিলো বিক্রি করে নাতনীদের বিয়ে দিয়েছেন।

কেমন আছেন- প্রশ্নের উত্তরে আকাশের দিকে হাতজোড় করে বিড়বিড় করে বলছিলেন- ‘ভগবান, নিঃশ্বাসটা নিয়ে যাও, মোক তুলো নেও। রাতে শোয়ার পর এক ঘুমে নিয়ে যাও- ভগবান। আর কষ্ট সয়না।’ তখন দুচোখ বেয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিলো কিরন বালার চোখের জল। দাঁতগুলো একটাও নেই। ভাঙ্গা চোয়াল, কপাল জুড়ে চিন্তার বলিরেখা। যার কপালের গভীর ভাঁজে যেন- স্পষ্ট লেখা সারাজীবনের কষ্ট-যন্ত্রনা আর লাঞ্ছনা-বঞ্চণার ইতিহাস।

কিরন বালা বলছিলেন- ছয়-সাত মাস পর পর বয়স্ক ভাতার দু’শ কম দুই হাজার টাকা পান তিনি। সেই টাকায় জীবন চলে না। মুখে পড়েনা মাছ, গোশত। টাকার অভাবে হয়নি চোখের ছানির অপারেশন। তিনবেলা রান্না করতে পারেন না। পাড়া পরশীর কাছে চেয়ে চিন্তে দুমুঠ ভাত পেটে দেন কখনো কখনো।

কিরন বালা মানুষের জায়গায় ঘর তুলে মাথা গুঁজে আছেন। ঘরের চালে ভাঙা টিন। বর্ষায় পানি পড়ে। শীতের কুয়াশা আটকাতে চালে জোড়া তালি দিয়েছেন। ছোট্ট একটা চৌকিতে রাত কাটান। ঘরে বিদ্যুৎ নেই। দিয়াশলাই আর কেরোসিনের সাহায্যে কাচের ল্যাম্প জ্বলে এখনো। দুটা কম্বল জোড়া দিয়ে শীত কাটেনা। এই তীব্র শীতে মোটা কাপড়ও জোটেনি। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে নিজের দু:খ-গাঁথা তুলে ধরেন কিরন বালা। 

কিরন বালার মতো অসহায় মানুষগুলো এই দেশেরই নাগরিক। যারা রাষ্ট্রের অর্থনীতির পাটাতন মজবুত করতে নিজেদের বিলিয়ে দেন- তাদের শেষ জীবনে ভর করতে হয়, অন্যের করুনায়। যাদের জন্য রাষ্ট্রের শান্তনা বরাদ্দ বয়স্ক ভাতা। সেই বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য জনপ্রতিনিধিদের খুশি করতে হয়, সেকথা সবারই জানা। কথা বলতে বলতে তিরস্কারের হাসি দিয়ে কিরন বালা বলছিলেন- ছয় মাস, সাত মাস পর পর দুইশ কম দুই হাজার টাকা পান বয়স্ক ভাতা। পান, সুপারি আর আলোয়া পাতা কিনতেই শেষ। 

এই দূর্মুল্যের বাজারেও যারা সামান্য টাকা বয়স্ক ভাতা নির্ধারণ করেছেন- জানতে ইচ্ছে করে, সেই নীতিনির্ধারকগণের বাসার গৃহকর্মীর বেতন কত? কিংবা পোষা বিড়ালটার মাসিক বাজেট কত? রেষ্টুরেন্টে ৩০ মিনিটের বিল কত টাকা? তবে কোন বিবেকে কিরন বালাদের জন্য এতো সামান্য বাজেট রাখেন উপরতলার কর্তারা!

ভাষার লড়াই থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে রক্ত গঙ্গা বয়ে যায়, কিরন বালাদের কপালে জুড়ে বসা বৈষম্যের তিলক যেন আরো গাঢ় হয়। 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad