Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • তারিখঃ ১৪-১০-২০২৬, সময়ঃ সন্ধ্যা ০৬:৩৭
  • ৬৭ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

বিবাহ বিচ্ছেদের বলি শিশুরা। নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

বিবাহ বিচ্ছেদের বলি শিশুরা। নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

গোলাপ মোস্তাফিজ ►
বাবা-মায়ের হাত ধরে বিদ্যালয়ে যাওয়া, পরিবারের সবার সঙ্গে আনন্দে বেড়ে ওঠা কিংবা ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলা এটাই একটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশব। কিন্তু বাবা-মায়ের দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ অনেক শিশুর কাছে সেই স্বাভাবিক জীবনকেই করে তুলছে অনিশ্চিত। কারও শৈশব কাটছে মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত হয়ে, কেউ হারাচ্ছে পড়াশোনার সুযোগ, আবার কেউ অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়ছে শ্রম কিংবা বাল্যবিয়ের মতো ঝুঁকিতে। সংসার ভাঙার সিদ্ধান্ত বড়দের হলেও এর গভীর ক্ষত বহন করতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের।

নওগাঁ’র মান্দা উপজেলার নাজমুল হোসেনের জীবন যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর। তখন দেড় বছরের ছোট বোন নাজমাকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান তাদের মা। 

এরপর থেকে সৎমা ও দাদা-দাদির কাছে বেড়ে উঠতে থাকে দুই ভাইবোন। যথাযথ অভিভাবকত্ব ও যত্নের অভাবে জীবিকার তাগিদে পড়ালেখা ছেড়ে নাজমুলকে পাড়ি জমাতে হয় ঢাকায়। অন্যদিকে, তার ছোট বোন নাজমাও শিকার হয় বাল্যবিয়ের। এখন সেই বোনের কোলেও এসেছে আরেক শিশু।

নিজের জীবনের এই নির্মম অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে নাজমুলের কণ্ঠে ফুটে ওঠে অভিমান আর অসহায়ত্ব। তার প্রশ্ন, বাবা-মা একে অপরকে ছেড়ে চলে গেলেও এখানে সন্তানদের দোষ কোথায়? নাজমুল বলেন, “বাবা-মায়ের ভালো না লাগলে একজন আরেকজনকে ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু সন্তানরা কী দোষ করেছে? আমরা কোথায় যাব, আমাদের কী হবে এই কথা একবারও কেউ ভাবে না।”

নাজমুলের মতোই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসি। নামের সঙ্গে তার মুখে হাসি থাকলেও ভেতরে জমে আছে দীর্ঘদিনের শূন্যতা। মাত্র সাত বছর বয়সে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে বাবার সান্নিধ্য ছাড়াই বেড়ে উঠছে সে। সময়ের ব্যবধানে বাবার চেহারাও প্রায় ভুলতে বসেছে হাসি।

হাসির কষ্টটা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় বিদ্যালয়ে। অন্য শিশুদের বাবা-মা যখন তাদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন, তখন নিজের অভিভাবকদের অনুপস্থিতি তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। হাসি বলেন, “সবাই সবার মা-বাবার কাছে থাকে, আমি থাকতে পারি না। সবাইকে মা-বাবা বিদ্যালয়ে নিয়ে আসে, আমি আমার মা-বাবাকে বিদ্যালয়ে উপস্থিত করতে পারি না। তখন আমার খুব খারাপ লাগে। ছয় বছর হয় আমি আমার বাবাকে দেখিনি। বাবার চেহারা মনে করতে পারি না। ভবিষ্যতে হয়তো ভুলেই যাব যে আমার বাবা আছেন কি নেই।”

হাসির জীবনে মা-বাবার শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছেন তার নানী। কিন্তু বয়সের ভার আর সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কতটুকুই বা পারেন তিনি? নানীর কথায়, ভালোবাসা দিয়ে শিশুটিকে আগলে রাখলেও মা-বাবার অভাব পূরণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। হাসির নানী বলেন, “আমি নানী হয়ে কি আর মা-বাবার অভাব পূরণ করতে পারি? পারি না। আমি যতটুকু পারি দেখাশোনা করি। হাসি এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। একটু বড় হলে ভালো ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দেব। এ ছাড়া আমার আর কী করার আছে?”

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা শুধু নাজমুল কিংবা হাসির জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। বিচ্ছেদের পর সন্তানকে একা হাতে বড় করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন অনেক অভিভাবকও। 

২৫ বছর বয়সী আফসানা মিমির জীবনেও এমনই এক বাস্তবতা। গর্ভাবস্থার মাত্র তিন মাসের মাথায় পারিবারিক কলহের কারণে তাকে বাবার বাড়িতে চলে আসতে হয়। পরবর্তী সময়ে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটে। সন্তান জন্মের পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও শিশুটি এখনো বাবার মুখ দেখেনি। বাবাও রাখেননি কোনো খোঁজখবর। চাকরির প্রয়োজনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইরে থাকতে হয় মিমিকে। ফলে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার কষ্ট তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।

আফসানা মিমি বলেন, “চাকরির জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাকে বাইরে থাকতে হয়। বাচ্চাকে সময় দিতে পারি না। মা-বাবা, দাদা-দাদি, ফুফু সবার আদর-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আমার সন্তান। বাবা হলো সন্তানের বটগাছের মতো, ছায়ার মতো। কিন্তু সেই ছায়াটা সে পাচ্ছে না। আমি জানি না, আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে।”

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও উন্নয়নকর্মীদের মতে, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের প্রভাব শুধু শিশুর তাৎক্ষণিক মানসিক কষ্টেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যথাযথ পরিচর্যা, নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা ও অভিভাবকত্বের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে তাদের শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পরিস্থিতিভেদে কেউ পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে, কেউ শিশুশ্রমে যুক্ত হয়, আবার কেউ বাল্যবিয়ে কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিতে পড়ে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি অমিতাভ দাস হিমুন বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, বিবাহবিচ্ছেদের কারণে অনেক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কেউ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে, কেউ আবার কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে। উন্নয়নকর্মী উত্তম কুমার দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করছেন। তার মতে, বিচ্ছেদ হওয়া পরিবারের শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়ে। নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যে সহায়তা ও সুযোগ প্রয়োজন, তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়।

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ একটি শিশুর মনে নিরাপত্তাহীনতা, একাকিত্ব, হীনম্মন্যতা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিচ্ছেদের পর মা-বাবার একজন বা দুজনের সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে শিশুর মনে পরিত্যক্ত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। যথাযথ যত্ন ও মানসিক সহায়তা না পেলে এসব অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

গাইবান্ধা সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক মো. জিল্লুর রহমান মনে করেন, বিবাহবিচ্ছেদের কারণে শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি তারা নেশা কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। অভিভাবকত্বের অভাব মেয়েশিশুদের বিয়ের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি করতে পারে। তার মতে, একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শুধু খাবার, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানসিক নিরাপত্তা, ভালোবাসা, যত্ন এবং ভবিষ্যৎ গঠনের উপযুক্ত পরিবেশ।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) এবং সাবেক বিভাগীয় পরিচালক রংপুর, ডা. এবিএম আবু হানিফ। তিনি বলেন, বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া পরিবারের শিশুদের মন-মানসিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক গঠন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও পড়তে পারে। যথাযথ পরিচর্যা ও সহায়তার অভাবে এসব শিশু সমাজের মূলধারা থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়ার বাইরেও যে একটি শিশুর দীর্ঘশ্বাস, কান্না ও অনিশ্চয়তার গল্প থেকে যায়, তা নিজের কর্মজীবনে দেখেছেন গাইবান্ধা জেলা  সাবেক লিগ্যাল এইডের কর্মকর্তা এবং বর্তমান বগুড়ার সিনিয়র সিভিল জজ মোছা. মাসুমা খানম জুথি।
তার অভিজ্ঞতায়, দাম্পত্য বিরোধ ও বিচ্ছেদের ঘটনায় অনেক শিশুকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখা যায়। মা-বাবার বিচ্ছেদের সময় শিশুদের অসহায়ত্ব ও মানসিক কষ্ট তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

মোছা.মাসুমা খানম জুথি বলেন, “বিবাহ বিচ্ছেদ সমাজে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার অফিসে মানুষ সবচেয়ে বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আসে। এর কারণে সামাজিক ও মানসিক বিকাশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের পরিবারের শিশুরা। যখন বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়, তখন তাদের কোলে থাকা শিশুদের দিকে তাকালে বিচারক হয়েও নিজের কান্না চলে আসে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ সন্তানের জন্য খুবই মর্মান্তিক।”

বাংলাদেশেও বিবাহবিচ্ছেদের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২’ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার ২০২১ সালের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জরিপে পরিমাপ করা হার দ্বিগুণ হয়। বর্তমানে তালাকপ্রাপ্ত এর সংখ্যা হলো ৭.৪ শতাংশ। তবে বর্তমানে এই হার আরো অনেক বেশিই বলে ধারণা করা যায়।

তবে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বাড়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি বিচ্ছেদের ঘটনায় শিশুরা একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিচ্ছেদের পর মা-বাবার দায়িত্বশীল আচরণ, সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ এবং আর্থিক ও মানসিক সহায়তা শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হলেও সন্তানদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা মা-বাবা উভয়ের দায়িত্ব। বিচ্ছেদের পরও সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

একটি শিশুর কাছে মা-বাবা শুধু পরিচয়ের অংশ নন, তারা তার নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও স্বপ্নের আশ্রয়। সেই আশ্রয়ে ভাঙন ধরলে শিশুটির ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘটতে পারে, কিন্তু সন্তানের প্রতি মা-বাবার দায়িত্ব কখনো শেষ হয়ে যায় না।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad