সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর ►
ইংরেজি অক্ষর ‘এ’ আকৃতির বাঁশের মাচা। সেই মাচাজুড়ে ঝুলছে নানা আকৃতি ও রঙের তরমুজ। কোনোটি সবুজ, কোনোটি হলুদ, আবার কোনোটি ডোরাকাটা। আকারেও রয়েছে বৈচিত্র্য। দুই-আড়াই কেজি থেকে শুরু করে চার-পাঁচ কেজি ওজনের তরমুজও ঝুলছে মাচায়। এমন দৃশ্য দেখে আনন্দে আত্মহারা চাষি এখলেছুর রহমান। প্রথমবার তরমুজ চাষ করেই তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন স্থানীয়দের।
দিনাজপুর সদরের নশিপুরে ৮০ শতক জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে মাচায় তরমুজ চাষ করেছেন আধুনিক কৃষকএখলেছুর রহমান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় প্রদর্শনী হিসেবে শুরু করা এই চাষ এখন পরিণত হয়েছে সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোগে। জমিতে প্রতিটি গাছে তিন থেকে পাঁচটি পর্যন্ত তরমুজ ধরেছে। মাচাজুড়ে ঝুলে থাকা তরমুজ দেখতে প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন।
এখলেছুর রহমানের জমিতে সূর্য, ডিম, কিং সুগার, কিং সুগার, বিগ বাইট, সুইট বাইট ও লিওনা জাতের তরমুজ চাষ করা হয়েছে। জাতভেদে তরমুজের রং ও আকৃতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। কোনো তরমুজ সবুজ, কোনোটি হলুদ, আবার কোনোটি ডোরাকাটা। মাচায় ঝুলে থাকা এসব তরমুজের অধিকাংশের ওজন দুই থেকে আড়াই কেজি হলেও চার থেকে পাঁচ কেজি ওজনের তরমুজও রয়েছে।
চাষি জানান, জুলাই মাসের শেষের দিকে জমি প্রস্তুত করে মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজের বীজ রোপণ করেন তিনি। এরপর কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত সার, জৈব সার, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরিচর্যা করেন। তরমুজের লতা মাটিতে না রেখে বাঁশের মাচায় তুলে দেন। প্রতিটি তরমুজকে নেটের সাহায্যে মাচার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৮০ শতক জমিতে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার তরমুজ ধরেছে বলে জানান তিনি।
মাচা তৈরিতে বাঁশ ও সুতার খরচ বেশি হয়েছে। তবে এই মাচা পরবর্তী ফসলেও ব্যবহার করা যাবে বলে জানান কৃষক। সব মিলিয়ে ৮০ শতক জমিতে এ পর্যন্ত তার প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আর মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে তরমুজ বাজারজাত করার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
এখলেছুর রহমান বলেন, ‘দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছি। জীবনে প্রথমবার মাচায় তরমুজ চাষ করেছি। শুরুতে অনেকটা শঙ্কায় ছিলাম। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে থাকা, সঠিক সময়ে পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ কাজে লাগানোর কারণে আল্লাহর রহমতে ৮০ শতক জমিতে ব্যাপক তরমুজ ধরেছে। বিভিন্ন জাতের তরমুজের আকার, আকৃতি ও রং দেখে এখন আমার মন ভরে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘দিন-রাত তরমুজখেতে সময় দিতে হচ্ছে। প্রতিটি তরমুজ নেট দিয়ে মাচায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাজারে তরমুজ ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আমার তরমুজ দেখতে সুন্দর, আকারেও ভালো এবং মিষ্টি হওয়ায় ভালো দাম পাওয়ার আশা করছি। সব মিলিয়ে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হতে পারে। খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছি।
একলেছুর রহমানের তরমুজখেত দেখতে আসা প্রতিবেশী কৃষক মোসাব্বিরুল রহমান মিঠু বলেন, ‘আমরা প্রথমে তরমুজ চাষ নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় ছিলাম। কিন্তু এখন জমিতে যে পরিমাণ তরমুজ ধরেছে, তা দেখে আমাদের সেই শঙ্কা কেটে গেছে। একেকটি গাছে অনেকগুলো তরমুজ ধরেছে। আমি, আমার ভাই এবং শ্রমিকরা মিলে দিন-রাত জমির পরিচর্যা ও পাহারা দিচ্ছি। এই তরমুজ চাষ আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আগামীতে আরও বড় পরিসরে তরমুজ চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরেক কৃষক আখতারুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘আমাদের গ্রামে প্রথম এখলেছুর রহমান ভাই তরমুজ চাষ করেছেন। জমিতে এত তরমুজ ধরেছে যে দেখতে সত্যিই ভালো লাগছে। তার কাছ থেকে তরমুজ চাষের বিভিন্ন কলাকৌশল জানছি। নিজের চোখে খেত দেখে আগ্রহ আরও বেড়েছে। আগামীতে আমিও তরমুজ চাষ করার পরিকল্পনা করছি।
স্থানীয় কৃষক মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম এই জমিতে তরমুজ চাষ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু একলেছুর রহমান সঠিক পরিকল্পনা, সময়মতো পরিচর্যা ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন। পাশের জমিতেই আমার আবাদ। আগামীতে আমিও তার মতো মাচায় তরমুজ চাষ করতে চাই। কর্ণাই গ্রাম থেকে তরমুজখেত দেখতে আসা রুবেল হোসেন বলেন, ‘আগে আমরা দিনাজপুর শহর থেকে তরমুজ কিনে বাড়িতে নিয়ে যেতাম। দিনাজপুরের মাটিতে এভাবে তরমুজ চাষ হতে পারে, তা কখনো ভাবিনি। বিভিন্ন আকার ও রঙের তরমুজ দেখে খুব ভালো লেগেছে। এই চাষ দেখে আমারও তরমুজ চাষ করার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুম তুষার বলেন, ‘দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এ বছর বেশ কিছু জমিতে প্রদর্শনী হিসেবে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। কৃষক এখলেছুর রহমানকে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়েছি। তবে তিনি আমাদের সহযোগিতার চেয়ে আরও বেশি জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করেছেন। সঠিক সময়ে সঠিক সার, বালাইনাশক, জৈব সারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কৃষককে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফলে তার জমিতে তরমুজের ভালো ফলন হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দিনাজপুর অঞ্চলে তরমুজ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে অসময়ে তরমুজ বাজারজাত করতে পারলে কৃষক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান। একলেছুর রহমানের জমিতে তরমুজের ফলন ও কৃষকদের আগ্রহ দেখে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে তরমুজ চাষ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের তরমুজের চাহিদার একটি অংশও স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।