• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

দাসপ্রথামুক্ত মানবিক বিশ্ব কি সত্যিই গড়া সম্ভব?

দাসপ্রথার বিস্তার ও বিলোপ

প্রকৌশলী কে এম জয়নুল আবেদীন ►দাসপ্রথার অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু পুরোনো। যুগে যুগে মানুষ দাসপ্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছে, আইন হয়েছে, আন্তর্জাতিক ঘোষণা এসেছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—প্রাচীন যুগের দাসপ্রথা কি সত্যিই বিলুপ্ত হয়েছে, নাকি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তার রূপ ও কৌশল বদলেছে? আজও মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, ঋণের দায়ে শ্রমদাসত্ব, শিশুশ্রমের শোষণ, জোরপূর্বক বিয়ে, গৃহকর্মীদের বন্দিদশা এবং যৌন শোষণের মতো নানা রূপে আধুনিক দাসপ্রথা বিদ্যমান। বাহ্যিক চেহারা বদলেছে, কিন্তু মূল অন্যায়টি একই রয়ে গেছে—ক্ষমতাবানদের হাতে দুর্বল মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া। কেন এত আইন, ঘোষণা ও সামাজিক আন্দোলনের পরও এই অন্যায় বন্ধ হচ্ছে না? এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতার অসম বণ্টন, সীমাহীন মুনাফার আকাঙ্ক্ষা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং অনেক ক্ষেত্রে সমাজের নীরব উদাসীনতা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শক্তিশালীদের সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছে দুর্বল মানুষের শ্রম ও অধিকারকে উপেক্ষা করে। আজও তার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ দেখা যায়।সমস্যাটি এই নয় যে সমাজে সবার সম্পদ, সামর্থ্য বা ক্ষমতা সমান নয়। মানুষের যোগ্যতা, উদ্যোগ ও অর্জনে পার্থক্য থাকবেই। বিপদ শুরু হয় তখন, যখন এই পার্থক্য অন্যের অধিকার হরণ ও শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ক্ষমতা, সম্পদ কিংবা সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা দূর করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে মানবিক মর্যাদার সমন্বয় থাকবে।


মানবিকতা, সহমর্মিতা ও উদারতা মানুষের মহৎ গুণ। কিন্তু এগুলোর চর্চা অনেকাংশেই ব্যক্তির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তাই কেবল ক্ষমতাবানদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়া সম্ভব নয়। ন্যায়বিচারকে সামাজিক অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ন্যায্য আইন, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, শ্রমিকের অধিকার, সমান সুযোগ, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা। এখানেই বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়ীদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের দায়িত্ব শুধু বৈষম্য চিহ্নিত করা, অন্যায়ের সমালোচনা করা কিংবা প্রতিবাদী স্লোগান তৈরি করা নয়। বরং বিরোধপূর্ণ স্বার্থের মধ্যেও পারস্পরিক কল্যাণের বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করা। এমন ‘উভয় পক্ষের স্বার্থরক্ষাকারী’ বা উইন-উইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও মানুষের মর্যাদা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান—সবই সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একে অন্যের পরিপূরক হতে পারে।


এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর শ্রমিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। তবে কোনো দেশের মডেল অন্ধভাবে অনুকরণ না করে নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দায়িত্ব শুধু মানবসমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বন, নদী, সমুদ্র, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যও পৃথিবীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের জন্য প্রকৃতির নির্বিচার ব্যবহার ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মসহ সব প্রাণের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়; বৃহত্তর জীবজগতেরই একটি অংশ। তাই মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা প্রকৃতির প্রতিও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। দাসপ্রথার অবসান অবশ্যই মানবসভ্যতার একটি অবিচল লক্ষ্য হতে হবে। কিন্তু শুধু স্লোগান দিয়ে এর অবসান সম্ভব নয়। প্রয়োজন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রয়োগ, ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে মানবিকতার চর্চা। সভ্যতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত ক্ষমতাবানরা কত সম্পদ অর্জন করলেন, তা দিয়ে নয়; বরং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সুযোগ নিয়ে বাঁচতে পারছেন, তা দিয়ে। মানবিকতা একটি স্বেচ্ছায় চর্চার মহৎ গুণ, কিন্তু ন্যায়বিচার হতে হবে সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার। আসুন, শুধু দাসপ্রথা বিলুপ্তির স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে এমন একটি ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করি, যেখানে মানুষের সমৃদ্ধি কিংবা কোনো জীবের অস্তিত্ব অন্যের শোষণ ও বঞ্চনার ওপর নির্ভরশীল হবে না। মানবতা এবং পৃথিবীর সকল প্রাণের জন্য এটাই আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।


লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ এবং ঢাকাস্থ গাইবান্ধাবাসী।