প্রকৌশলী কে এম জয়নুল আবেদীন ►
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক খাদ্য ক্ষয় ও অপচয় সচেতনতা দিবসে আমাদের সবার সামনে এক কঠিন সত্য দাঁড়িয়ে আছে-পৃথিবীতে খাদ্যের অভাবের চেয়ে বড় সমস্যা হলো খাদ্যের অপচয়। একদিকে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমায়, অন্যদিকে প্রতিদিন অসংখ্য খাবার ডাস্টবিনে চলে যায়। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ রক্ষায় এই বৈপরীত্য আমাদের অবশ্যই বদলাতে হবে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৬০ থেকে ৭০ কোটি মানুষ ক্ষুধায় ভুগেছে। একই সময়ে প্রতি বছর পৃথিবীতে ১০৫ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয় এবং শুধু পরিবার থেকেই নষ্ট হয় মোট অপচয়ের ৬০ শতাংশ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্য হলো-প্রতিদিন বিশ্বে একশ কোটিরও বেশি খাবারের অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয় রোধ করা গেলে ক্ষুধার্ত মানুষের একটি বড় অংশের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে।
আয়ারল্যান্ডের মহাদুর্ভিক্ষ (১৮৪৫-১৮৫২), চীনের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (১৯৫৯-১৯৬১), ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষ (১৯৮৪-৮৫) এবং আমাদের নিজের ১৯৪৩ সালের বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ-এসব শুধু খাদ্যের সংকটের ইতিহাস নয়, মানবিক ব্যর্থতারও ইতিহাস। লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে প্রাণ হারিয়েছিল। সেই বেদনাদায়ক স্মৃতি আজও আমাদের শেখায়-খাদ্যের প্রতি অবহেলা কখনোই সভ্যতার লক্ষণ হতে পারে না। খাদ্য ক্ষয় ও অপচয় এক জিনিস নয়। ক্ষয় ঘটে মাঠ থেকে বাজারে পৌঁছানোর পথে-ফসল কাটার পর সংরক্ষণ, পরিবহন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের দুর্বলতায়। আর অপচয় ঘটে আমাদের ঘরে, হোটেলে, রেস্তোরাঁয়, বাজারে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে, যখন খাওয়ার উপযোগী খাবার ফেলে দেওয়া হয়। এই দুই সমস্যাই প্রতিরোধযোগ্য।
বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের খাদ্য উৎপাদনকে নিয়মিত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। তবুও আমরা গম, ভোজ্যতেল, ডালসহ নানা খাদ্যপণ্য আমদানি করি। যদি আমরা উৎপাদিত খাদ্যের ক্ষয় ও অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারি, তবে খাদ্য আমদানির ওপর চাপ কমবে, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করা যাবে। খাদ্য সংরক্ষণ তাই কেবল কৃষির বিষয় নয়-এটি জাতীয় অর্থনীতিরও বিষয়।
সমাধান শুরু হয় আমাদের নিজের ঘর থেকে। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কিনি, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করি, পরিমিত রান্না করি এবং উদ্বৃত্ত খাবার ভাগ করে দিই। সন্তানদের শেখাই-একটি ভাতের দানাও অবহেলার নয়; এটি একজন কৃষকের ঘাম, প্রকৃতির দান এবং সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত। সরকার, ব্যবসায়ী, কৃষক ও নাগরিক-সবার সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। আধুনিক গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, খাদ্য ব্যাংক এবং উদ্বৃত্ত খাদ্য বিতরণের কার্যকর ব্যবস্থা লাখো টন খাদ্য বাঁচাতে পারে। প্রযুক্তি যেমন খাদ্য রক্ষা করতে পারে, তেমনি সচেতনতা বদলে দিতে পারে মানুষের অভ্যাস।
আজকের এই দিবসে আসুন আমরা একটি জাতীয় অঙ্গীকার করি-খাদ্যকে পণ্য নয়, জীবন হিসেবে দেখব। কারণ পৃথিবীর কোথাও একটি শিশু যখন ক্ষুধায় কাঁদে, তখন অন্য কোথাও একটি থালা ভরা খাবার ফেলে দেওয়া মানবতার পরাজয়। খাদ্য বাঁচানো মানে শুধু অর্থ সাশ্রয় নয়; ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, পরিবেশ রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা। আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করি-“অপচয় নয়, সংরক্ষণ; উদ্বৃত্ত নয়, ভাগাভাগি। খাদ্য বাঁচান, মানবতা বাঁচান।”
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ এবং ঢাকাস্থ গাইবান্ধাবাসী